নো ইজি ডে : লাদেন হত্যার প্রত্যক্ষ বয়ান-৪
এইদেশ সংগ্রহ , বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১২


মশিউল আলম : আকাশে চাঁদ নেই, অ্যাবোটাবাদ শহরে লোডশেডিং চলছে। সর্বাধুনিক সমরপ্রযুক্তিতে সুসজ্জিত মার্কিন কমান্ডো বাহিনী পুরো অভিযান চালাচ্ছে পিচকালো আঁধারে নিমজ্জিত বাড়িটির ভেতরে। অভিযানে অংশগ্রহণকারী ২৪ জন কমান্ডো, অভিযান পরিচালনাকারী অফিসার ও সিআইএর লোকজন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বেতারযন্ত্রের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, যেটাকে বলা হচ্ছে ‘ট্রুপ নেট’। অন্ধকার আকাশের কোথাও
চিলের মতো চক্কর খাচ্ছে চালকবিহীন বিমান (ড্রোন), সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে পুরো অভিযানের ভিডিওচিত্র। ওয়াশিংটন ডিসিতে বসে অভিযান পর্যবেক্ষণ করছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারিসহ পেন্টাগন-সিআইএর কর্তারা। লাদেনকে হত্যা করা হয়েছে—অভিযান পরিচালনাকারীর মুখ থেকে তাঁরা এই নিশ্চিত ঘোষণা শোনার জন্য উদগ্রীব।
কিছুক্ষণ আগেই নিথর হয়ে গেছে লাদেনের বিধ্বস্ত-রক্তাক্ত দেহটি; মেঝেতে নিজের রক্তের ধারায় ডুবে যাচ্ছে তাঁর লাশ। খাটে নিজের একটি পায়ের কবজি চেপে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করছে একটি মেয়ে; দূরের এক কোণে, ব্যালকনিতে যাওয়ার স্লাইডিং কাচের দরজার গোড়ায় গুটিসুটি বসে আছে তিনটি ভয়ার্ত, নির্বাক শিশু।
ম্যাট বিসোনেট লিখছেন, ‘লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াল্ট। এখনো অন্ধকার, লোকটির মুখ দেখে তাকে চেনা যাচ্ছে না।..আমি আমার হেলমেটের রেইল সিস্টেমের সঙ্গে লাগানো লাইটটি জ্বালালাম।... বাড়ির সব জানালায় পর্দা টানা, বাইরে থেকে কেউ আমাদের দেখতে পাচ্ছে না, সুতরাং এখন আলো জ্বালানো চলে।
‘..বুলেটের আঘাতে চুরমার হয়ে গেছে লোকটির মুখমণ্ডল। কপালের ডান পাশে একটা গর্ত, মাথার ডান অংশটি উড়ে গেছে। ঝাঁজরা হয়ে গেছে বুকের বুলেটবিদ্ধ জায়গাগুলো। সে পড়ে আছে, রক্তের ধারা বেড়ে চলেছে তার চারপাশে। আমি উবু হয়ে আরও কাছে থেকে তাকে দেখার জন্য তাকালাম, আমার পাশে টমও তাই করল।’
‘টম বলল, “আমার মনে হচ্ছে, এ সে-ই।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে কথা বেতারে জানিয়ে দিল না টম, কারণ ও জানে এই খবর ওয়াশিংটনে পৌঁছে যাবে বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গের মতো। আমরা জানি, প্রেসিডেন্ট ওবামা শুনছেন। সুতরাং আমাদের কোনো ভুল না হয়ে যায়।
‘আমি আমার মাথার ভেতরের চেকলিস্টগুলো একবার উল্টেপাল্টে দেখে নিলাম: লোকটা বেশ দীর্ঘ। প্রায় ছয় ফুট চার ইঞ্চি। ঠিক আছে, মিলে যাচ্ছে। তিনতলায় পুরুষ লোক থাকার কথা মাত্র একজন, তিনি লাদেন। মিলে যাচ্ছে। দুই বার্তাবাহক যে দুই জায়গায় থাকবেন বলে সিআইএ আমাদের বলেছিল, তাঁরা ঠিক সেই দুই জায়গাতেই ছিলেন। মিলে যাচ্ছে।
‘যতই তাঁর মুখের দিকে দেখি, আমার চোখ আকৃষ্ট হয় নাকটির দিকে। নাকটি অক্ষত আছে, আমার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিট থেকে বুকলেট বের করে কমপোজিট ফটোগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম। লম্বা নাকটি মিলে যাচ্ছে। দাড়ি ঘনকালো, আমি যেমন ভেবেছিলাম, সে রকম পাকা চুল একটাও চোখে পড়ল না।...
‘রাবারের গ্লাভস হাতে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে শুরু করলাম, ওয়াল্ট তৈরি হতে লাগল কয়েক সেট ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য।..খাটের ওপর যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলেন যে মহিলা, তাঁর পায়ের জখমের শুশ্রূষা করছিল উইল, ও আরবি বলতে পারে। আমরা পরে জেনেছি, মহিলার নাম আমাল আল-ফাতাহ, লাদেনের পঞ্চম স্ত্রী। আমি জানি না কখন কীভাবে তিনি জখম হয়েছেন, কিন্তু জখমটা খুবই সামান্য। সম্ভবত বুলেটের টুকরা বা ভাঙা কোনো কিছুর টুকরার আঘাত লেগেছে তাঁর পায়ের কবজিতে..।”
ঘটনার পরদিন লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে লেখা হয়, মহিলার নাম আমাল আহমেদ আল-সাদাহ, বয়স ২৯, একজন ইয়েমেনি, লাদেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় আফগানিস্তানে, ১১ বছর আগে। তিনি তাঁর পঞ্চম স্ত্রী। হোয়াইট হাউসের সূত্রে গার্ডিয়ান লেখে, তিনি পায়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। পত্রিকাটির একই প্রতিবেদনে লেখা হয়, ওই ঘরেই আহত হয়েছিল লাদেনের ১২ বছর বয়সী মেয়ে সাফিনা/সাফিয়া বা আয়েশা। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে লেখা হয়, মেয়েটির জখম ছিল পায়ের গোড়ালিতে; মার্কিন কমান্ডোরা লাদেনের শোবার ঘরে ঢোকার আগে সম্ভবত গ্রেনেড ছুড়েছিলেন।
লাদেনের মুখমণ্ডলের ছবি তোলার চেষ্টা করছেন ম্যাট। তিনি লিখছেন, ‘ওয়াল্ট তার কিট থেকে ক্যামেলব্যাক হোস টেনে বের করে লোকটার মুখে পানি ছুড়তে লাগল। আমি খাট থেকে একটা কম্বলের এক অংশ ব্যবহার করে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে রক্ত মুছে দিতে শুরু করলাম। প্রতি ঘর্ষণে মুখটি আরও পরিচিত মনে হতে লাগল। আমি তাঁকে যে রকম বয়স্ক ভেবেছিলাম, তার চেয়ে বেশ কম বয়সী দেখাচ্ছিল তাঁকে। তাঁর দাড়ি কালো, মনে হয় কলপ লাগানো হয়েছে।’
অভিযানের প্রস্তুতির সময় এক রাতে ম্যাট, ওয়াল্ট ও চার্লির মধ্যে গল্প হচ্ছিল: লাদেনকে পাওয়া গেলে তাঁর শরীরের কোন অংশে গুলি করা উচিত হবে, কার কী মত। ম্যাট লিখছেন: “‘ওয়াল্ট বলেছিল, ‘চেষ্টা কোরো, [মুদ্রণ-অযোগ্য] ..টার মুখমণ্ডলে গুলি না করার। কারণ, ওর ছবি সবাই দেখতে চাইবে।’ চার্লি বলেছিল, “কিন্তু যদি অন্ধকার থাকে, আর আমি ওর মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখতে না পাই, তা হলে আত্মঘাতী বোমায় মরার অপেক্ষা করব না।” আমি বলেছিলাম, ‘..সুযোগ যদি পাওয়া যায়, আমি বলব, বুকে গুলি চালানোই ঠিক হবে।’
ম্যাট দেখতে পেলেন, সেই এখন মুখটা সত্যিই বিধ্বস্ত। ছবি তোলার জন্য রক্ত পরিষ্কার করতে করতে তিনি ভাবছেন: ‘এ রকম জঘন্য একটা মুখ এমন কাছে থেকে দেখা কী অদ্ভুত! গত এক দশক ধরে আমরা যুদ্ধ করে চলেছি যে লোকটার কারণে, সে এখন আমার সামনে পড়ে আছে। ছবি তোলার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাগি আসামির মুখমণ্ডলের রক্ত পরিষ্কার করার চেষ্টা কেমন পরাবাস্তব মনে হচ্ছে!...এখন আমার দরকার ভালো মানের কিছু ছবি...
‘কম্বল সরিয়ে রেখে আমি আমার ক্যামেরাটা টেনে বের করলাম। এই ক্যামেরায় গত কয়েক বছরে শত শত ছবি তুলেছি আমি।..প্রথমে তুললাম পুরো শরীরের ছবি। তারপর হাঁটু গেড়ে তাঁর মাথার কাছে বসে তুললাম মুখের কয়েকটি ছবি। তাঁর দাড়ি ডানে ও বাঁয়ে সরিয়ে প্রোফাইলের কয়েকটি ছবি নিলাম। আমি আসলে চাচ্ছিলাম তাঁর নাকের ওপর ফোকাস করতে...আমি ওয়াল্টকে বললাম, “ওর ভালো চোখটা খুলে ধরো।” ওয়াল্ট নিচু হয়ে তাঁর চোখের পাতা টেনে ধরল, খুলে গেল প্রাণহীন খয়েরি চোখটি। আমি জুম ইন করে চোখের একটা ছবি নিলাম।...’
নিহত লাদেনের ছবি যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি। কিন্তু ইন্টারনেটে অনেক ছবি বেরিয়ে পড়েছিল। সেগুলোর অধিকাংশই নকল, বানানো ছবি। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ফ্রিডম অব ইনফরমেশন আইন ব্যবহার করে নিহত লাদেনের ছবি প্রকাশ করার জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ছবি প্রকাশের অনুমতি দেননি এই যুক্তি দেখিয়ে যে তার ফলে আমেরিকার প্রতি বিদ্বেষ বেড়ে যাবে। ম্যাট বিসোনেট (মার্ক ওয়েন) তাঁর নো ইজি ডে বইটিতেও কোনো আলোকচিত্র প্রকাশ করেননি।
তিনতলায় লাদেনের শোবার ঘরে ম্যাট যখন নিহত লাদেনের ছবি তোলায় ব্যস্ত, তখন বাইরে অভিযান শেষ করে কমান্ডোদের আফগানিস্তান ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কিন্তু সেখানে একটা বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই লেখার আগের পর্বগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি যে কমান্ডোদের বহনকারী দুটি ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টারের একটি নামার সময় লাদেনের বাড়ির বাইরের প্রাচীরের সঙ্গে তার পুচ্ছদেশের আঘাত লেগে ক্র্যাশ করে। সেটি অচল হয়ে সেখানেই পড়ে আছে। কমান্ডোদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবশিষ্ট হেলিকপ্টারটি যথেষ্ট নয়। তাই তাঁদের নিতে আসছে একটি চিনুক হেলিকপ্টার। কিন্তু তার আগে অচল হেলিকপ্টারটিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। বাইরে সেসব আয়োজন চলছে, ম্যাট বিসোনেট তাঁর হেলমেটের সঙ্গে যুক্ত ‘ট্রুপ নেটের’ মাইক্রোফোনে অন্য কমান্ডোদের কথাবার্তা শুনছেন, আর লাদেনের ছবি
তুলছেন। দ্বিতীয় দফায় তিনি ছবি তুললেন, সিল বাহিনীর ক্যামেরায়।
ওপাশে তাঁর সহযোদ্ধা ওয়াল্ট সংগ্রহ করছেন লাদেনের ডিএনএ নমুনা: ‘ওয়াল্ট লাদেনের রক্তে তুলা চুবিয়ে নিল, আর কিছু তুলা তাঁর মুখে গুঁজে দিয়ে নিল লালার নমুনা। অবশেষে ও বের করল সিআইএর দেওয়া স্প্রিং লাগানো একটা সিরিঞ্জ, অস্থিমজ্জার নমুনা সংগ্রহের জন্য। ঊরুর হাড়ে এই সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে অস্থিমজ্জার নমুনা কীভাবে সংগ্রহ করতে হয় তা আমাদের শেখানো হয়েছে। ওয়াল্ট লাদেনের ঊরুতে সিরিঞ্জ ঢোকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সুঁই কিছুতেই হাড়ের ভেতরে ঢুকছে না...’
অভিযানের এ পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তখনো বাকি। সেটি করার চেষ্টা করছেন ম্যাটের আরবি-জানা সহযোদ্ধা উইল। মেঝেতে যে লাশটি পড়ে আছে, সেটি যে সত্যিই ওসামা বিন লাদেনের, এটা নিশ্চিত করতে হবে। ম্যাট লিখছেন, ‘লাদেনের স্ত্রী আমাল পায়ের জখম নিয়ে এখন ছটফট করে চলেছেন, তিনি কোনো কথা বলতে নারাজ। অন্য মহিলার চোখ দুটি কান্নায় ফুলে উঠেছে, উইল আরবিতে তাঁকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, মৃত লোকটি কে? কিন্তু মহিলা কিছু বলছেন না, শক্ত হয়ে আছেন।
“তাঁর নাম কী?”
‘মহিলা বললেন, “শেখ।”’
‘উইল বলল, “শেখ কে?” মহিলা আরও কয়েকটি ডাক নাম বা ছদ্মনাম বললেন। উইল তখন সেখান থেকে গেল ব্যালকনিতে, শিশুদের কাছে। ওরা তখনো সেখানে দেয়ালের পাশে চুপ করে বসে আছে। উইল হাঁটু গেড়ে ওদের সামনে বসে একটি মেয়েকে বলল, “কে এই লোক?”
‘মেয়েটি মিথ্যা বলতে জানে না, সে বলল, “ওসামা বিন লাদেন।”
‘উইলের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ও মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি সত্যিই জানো তো, এটা ওসামা বিন লাদেন?”
মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ।”
‘...ব্যালকনি থেকে ফিরে আসার সময় উইল হলওয়েতে লাদেনের এক স্ত্রীর হাত চেপে ধরে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “এখন তামাশা বন্ধ করেন!”
আগের চেয়ে কঠোর কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল, “শোবার ঘরে লোকটি কে?”
মহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। ভীষণ ভয় পেয়ে বললেন, “ওসামা।”
উইল বলল, “ওসামা কী?”
মহিলা বললেন, “ওসামা বিন লাদেন।”’
[ মশিউল আলম : সাংবাদিক] প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত।