ফকির ইলিয়াস এর পাঁচটি কবিতা
ফকির ইলিয়াস , বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১২


-------------------------
সমবয়সী বালিকারা
--------------------------
পরীক্ষিত অগ্নির প্রতি আমার আগ্রহ একদিন এই বৈশাখকেও সাবালক করে তুলেছিল। সংগ্রহের সূর্য থেকে আলো ছিনিয়ে আমি রচেছিলাম যে-অক্ষর তা দিয়ে লেখা হয়েছিল কিছু নাম। শীর্ষ অভিভাবকত্ব নিয়ে কিছু নদী দাঁড়িয়েছিল আমার পাশে, আর বলেছিল, শরীরের প্রতি ছায়ার ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হোক।
আমি কারো ছায়াবালক ছিলাম, তা এখন আর মনে পড়ে না। সাদা শাড়ি পরে যে সব কিশোরীরা আমাকে অতিক্রম করেছিল, তারা কখনও প্রত্যাশা করে নি আমার স্পর্শের পরাগ। তবু গন্ধরাজ ফুলের পাপড়ি দিয়ে আমি ঢেকে দিয়েছিলাম তাদের যাত্রাপথ। আর বলেছিলাম, এক জনমে সবাই সাজতে পারে না জোছনা ভাসানে।
আমার পূর্বপুরুষগণ প্রেমিক ছিলেন। একদিন তারাও সবগুলো সাদা পাথর সাগরে ছুঁড়ে দিতেন, আর বলতেন, বেঁচে থাকো শোক। বেঁচে থাকো ভাস্কর্যগ্রহ।
আমি সেই প্রাচীন গ্রহের শরীরে তাদের প্রেমিকাদের দেহছায়া দেখেছি। পুষ্ট ভোরের গায়ে যে সূর্য লেপ্টে থাকে, সেই প্রখরতায় আমি দেখেছি তাদের কামনার উৎকণ্ঠা। হাড়-মাংসের উপত্যকা সরাতে সরাতে আমি খুঁজেছি রক্তের সংগোপন প্রবাহ। যে রক্ত, চিহ্ন রেখে যেতে যেতে নারীর উপশিরায় সরবরাহ করে ভোরের অক্সিজেন। তারপর নিমগ্নতার আকাশ এসে ঢেকে দেয় দেহদের নিষ্পলক ঘর।
সেই ঘরের ভেতরে চিরদিন লুকিয়ে থাকে যে নির্বাসন, আমি তাকে সাজিয়েছি চন্দ্র-চন্দনে। সঙ্গীঁ কেউ হবে না জেনেও শস্যের বদলে এই মাটিতে করেছি খণ্ডখণ্ড নিঃশ্বাসের চাষ। প্রভেদের শুশ্রূষা সেরে, দেখেছি পুষ্পও তার ইতিহাসে পুনরায় লিখে রাখে ভ্রমরজীবনের ইতিকথা।
খুব বেশি দূরে যেতে চাই নি আমি। কাছে থাকতে চেয়েছি, আর কাছে রাখতে চেয়েছি পরানের পত্রলিপি, জনপদে হারানো দুপুর যেভাবে ধারণ করে পথিকের ঘামবিন্দু, মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় এক ঝাঁক দোয়েল পূর্ণতার সন্ধান শেষে।
কয়েক টুকরো রৌদ্র বিয়োগের পর খুঁজতে চেয়েছি বৃষ্টির ভবিষ্যৎ। বলেছি, চিঠি দিয়ো। জানতে দিয়ো তোমাদের হেমন্ত শহরে কতটা ঘনিষ্ট হয়ে জেগে থাকে শস্যপাখি, কতোটা পবিত্র হয়ে সমুদ্র গ্রহণ করে সপ্তর্ষি আগুন।
অনেক উত্তরই পাইনি আমি। আমাকে একাকী ফেলে, চেনাপথে চলে গেছে কালের দক্ষিণ। আর যারা ফিরে আসবে বলে কথা দিয়েছিল, তাদের কেউ কেউ অবশেষে আমাকে চিনতেও পারেনি।
মনে পড়ে, পুণ্যবান হবো বলে একদিন পরীক্ষিত আগুনে আমিও পুড়তে চেয়েছিলাম। সমবয়সী বালিকারা, পাপড়ি ছিটিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিল আমার দেহ, সেদিন থেকেই সমুদ্রগামী সন্ধ্যার কিনারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল আমার সবগুলো হাড়গোড়।

-------------------------------------
ভালোবাসার উদ্বোধনী গান
-------------------------------------
আমরা ইতোমধ্যে শেষ করে ফেলি আমাদের নবম প্রদর্শনী। যারা
কিছুই দেখেনি, তারাও হাততালি দিয়ে বলে-ছবিগুলো বড় চমৎকার
ছিল। ছবি ও চিত্রের মাঝে পার্থক্যসমগ্র বুঝাতে বুঝাতে আমরা
রপ্ত করেছিলাম যে আঁকার কৌশল, তার হাড়গোড়ের পাশে দাঁড়িয়ে
একজন অগ্রজ সগর্বে বলেন, যৌবনে তার পেশিগুলো ছিল ঠিক
এরকমই। এবং তিনি ছিলেন সেকালে মসলিনের তাঁত-কারিগর।

যারা নির্মাণের কৃতিত্ব দেখাতে পারে, তাদের প্রতি আমার একটি
বিশেষ দুর্বলতা থাকে, তা তোমার আজানা ছিল না। তারপরও
তুমি বললে, আমি নাকি ঘুমন্ত পাখির শিল্পকলা বুঝি না। অথচ
তুমি এর আগেও দেখেছো, ঘুমন্ত নারীর মুখছবি নিয়ে আমার
শিল্পকর্ম পুরস্কৃত হয়েছে জলের আঙিনায়। নদী ও নারীর নিদ্রাচিত্র
এঁকে আমি সাজিয়েছি আকাশের মোহনা। মাটিগামী দেহের দরদ।

দেহে ভালোবাসার স্পর্শ লেগে থাকে। মগ্ন ভুলের সান্নিধ্যে প্রেমিক
পুরুষ বার বার হয়ে যায় উদাসী রাতের স্থাপক। যারা চাঁদের সাথে
আড্ডা দিতে জানে, তারাই বুঝে এর আগে এই নগরে কারা শিখেছে
সময়ের আড্ডাবিদ্যা। কাদের হাতের ছোঁয়ায় বার বার সিক্ত হয়েছে
ছায়ার ক্ষেত্রঘেরা স্বপ্ননিবাস। ভাস্কর্য সাজাবে বলে মানুষের পাদদেশে
কীভাবে সমুদ্রও বিছিয়ে দিয়েছে তার সুঢৌল স্তন।

পল রবসনের গান কিংবা পাবলো পিকাসোর আঁচড়ের মতো আমরাও
অতিক্রম করি বার্ষিক ভোরমেলা। শাদা ফুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
জেনে যাই, কাম-আদিমতম এক শিল্পের নাম। কামজ সূর্যের যাত্রাকথা
লিখে রাখে যেসব মানুষ, তারা কখনও বিমূর্ত হয়, কখনও প্রাণভরে কাঁদে।
জানি, একজনমে যারা কান্নাকে রপ্ত করতে পারে না, তারা কখনও
করে না অন্য কোনো সার্থক জনমের সন্ধান।

আমি শায়িত সমুদ্রের ভেতর বার বার পরখ করেছি তোমার মুখ।
তোমার চেয়ে থাকা দুপুরের বিগলিত বুকে হাত রেখে অনুভব করেছি,
প্রাণপাখি উড়ে যাবার জন্য কীভাবে ছটফট করে। আনন্দের পরিপূর্ণ
সায়রে, মুক্ত হেমন্তের সামন্তবাদ,কতোটা আপন হয়ে ধরে রাখে
সোনালি শস্যের সুখ। সুখী পাখিগুলো খুব নিচু দিয়ে উড়ে যেতে যেতে
কীভাবে ধারণ করে আড়ালের বৃত্তসূত্র।

মনে পড়ে, আমাদের যৌথ স্থাপনা এভাবেই শুরু হয়েছিল। এক বিকেলে,
বৃষ্টির দানা কুড়াতে গিয়ে না ভিজেই ফিরেছিলাম ঘরে। তারপর তুফানের
তূর্য আলোতে সারাজীবন ভিজবো বলে সাজিয়েছিলাম চাঁদের ঘরানা।
যদিও চাঁদের পক্ষপাত আমাদের অনুকূলে ছিল না, তবু বাসনা ছিল।
ছিল বৈভব আর রূপান্তরে ফিরে আসা নক্ষত্রের সার্থক জ্যোতি। আমাদের
চোখে মুখে জেগে ওঠা, শব্দের রঙ ।

আমাদের দৃশ্যপথ বার বারই ছায়া হয়ে যায়। যারা আকাশের গতি দেখে
প্রভাতের ছায়াবাজি শিখে, তারা ক্রমশ সম্পন্ন করে বীজের ভ্রমণ।
পুনর্মুদ্রণবিষয়ক সেমিনার থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে রচনা লিখে শিক্ষার্থী
মেঘ। মেঘের কিরণ আমাদের বাহুডোরে জমা হতে থাকে। আমরাও মত
বদলাই। যে আগুন আমাদের চিরশত্রু ছিল, তাকেও ভালোবাসতে থাকি।
এবং দেখি আমাদের কাক্সিক্ষত আগুন বুকে নিয়ে পুষ্ট মোমের মতো তুমি
শুয়ে আছো লালে ঘেরা জলের ভেতরে।

--------------
নার্সিংহোম
--------------
হেঁটে যাচ্ছে শাদা-এ্যাপ্রন পরা ক’টুকরো মেঘ
কয়েকটি ফটকে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষার দুপুর কাটাচ্ছেন
ক’জন অগ্রজ, শাদা ফ্রক পরে কয়েকটি মেয়ে
দৌড়াচ্ছে স্কুলের বারান্দায়। একটি সূর্য,ঘনিষ্ট
তাকিয়ে দেখছে পলেস্তরাখসা ইটের হাসি।

কেউ কুড়াচ্ছেন স্মৃতির খুঁটিনাটি, আর কেউ মৌন
গোলাপের পাপড়ি পরখ করে সাজাচ্ছেন
যথানিয়মে দরোজার কড়া, খুলে দেয়া পিঞ্জরের
কাঠি,স্পর্শ করে ধাপভাঙা নীলের দেয়াল।

‘এখানে বেদনা মোচন হয়’ কিংবা ‘এই সেবাশ্রমে
মানুষ খুঁজে পায় আলোর মসৃণ বাহু’-এমন বিলবোর্ড
পড়তে পড়তে আমি স্পর্শ করি তোমার হাত।
হঠাৎ লোডশেডিং এসে ঢেকে দেয় আমাদের চোখ
ইউনিফর্মগুলো খুলে পড়তে থাকে মাটিতে
তারপর আমরা ক্রমশই হারিয়ে যেতে থাকি
পোশাকবিহীন পৃথিবীর উত্তর-ঊরুতে ।

------------------------------
পুনরায় মেঘের দেয়ালে
------------------------------
হাত দিয়ে দেখতে চেয়েছি উষ্ণতার একান্ত উৎস। পুনরায়
মেঘের দেয়ালে কীভাবে রাখে তার ছায়া। অথবা ভুল
করে পাখিরা এই পর্বতের চূড়ায়, কীভাবে সানন্দে
ফেলে যায় পালক। এই প্রজাঘেরা আর্তির রাজ্য,
বেঁচে থাকে কার শাসনে। কিংবা ঋষি ও বিচ্ছেদ পার্বণে
কোন রাঙা ফুল দিয়ে সাজায় আসন। দেখতে চেয়েছি,
ছুটি হলে পাঠশালার বালক-বালিকা, বিনম্র সর্ষেক্ষেত
ছুঁয়ে কতো ধীরে রেখে যাচ্ছে তাদের পদছাপ। আর
ধুলো; ওড়ার প্রাচীন কৌশলে বিকেলের রোদে, তৈরি
করেছে আমাদের ভালোলাগার দীর্ঘ তালিকা
অনেক স্মৃতি ঘুঁটে সাজাতে চেয়েছি নদীদের বেণি। কালো চুল,
কালো চুখের রেখায় এঁকেছি মানচিত্র। প্রতিপাদ্য গদ্যের
হরফে। তারপর একদিন ভাঙচুরের অনন্ত আলোতে। পেতে
চেয়েছি তোমার সান্নিধ্য, ঋণপত্র বুঝে নিতে নিতে...
---------------------------------
আদিবৃক্ষ ও ভুলের ভ্রমণ
--------------------------------
পেছনে পড়ে থাকে খরার অসম্পূর্ণ গ্রহগাঁথা। দ্বীপবাসী ভুলের
কারুজে বেঁচে থাকে বৃক্ষের ব্যক্তিগত ঐতিহ্য। মানুষ হলে লিখে
রাখতে পারতো খাতায়। অথবা ঘোরপত্রে, মনের সীমান্তটুকু
মিশাতে মিশাতে আয়োজন করতে পারতো রঙ-প্রদর্শনীর। ভ্রমণের
বিগত অভিজ্ঞতাকে সঞ্চয় করে। সাজাতো দূরের নৈঃশব্দ্য-দুপুর।
মানুষেরা বৃক্ষ হলে আরো অনেক আগে, সকল মুখোশ খুলে ফেলে
গায়ে চড়াতে পারতো ট্রাফিক-পোশাক। হাতের ইশারায় বলে
দিতে পারতো, সবুজেরা কোন দিকে যাবে। অথবা কোন দিকে
যাবে দক্ষিণের হলুদ। রঙধনুর বৈশাখী সমতায়, কার ছায়া
হবে অনন্ত বৃষ্টি। কার বাগানে আকাশ ফোটাবে ফুল, বেদনার কলি।
বৃক্ষ ও ভুলগুলো একই সমান্তরালে দাঁড়াতে পারে নি। তবুও অক্সিজেন
বিনিময়ে বিশ্ববাজারে, বার বার হয়েছে একে অন্যের অলংকার। আর
আমরা যারা মন্দা অর্থনীতির অংক কষেছি, তারা সাক্ষী হয়ে
ফিরেছি নদীর কাছে। ঢেউসূত্রের ধারাবাহিকতায়। দেবার কিছুই
নেই জেনে, সূর্য যেমন নিবন্ধন করে মানুষের আয়ু, বংশ-পরম্পরায়।