সামাদ ভাইয়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল , বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১২


পরশু ফেইস বুকের কল্যাণে জানতে পারলাম, হাসপাতালে আতাউস সামাদের (১৬ নভেম্বর, ১৯৩৭- সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১২) একটি পা কেটে ফেলা হয়েছে! কষ্ট পেলাম। হঠাৎ মনে পড়লো কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা, মনে পড়লো লিমন হোসেনের কথা। ইলিয়াস ভাই নেই। লিমন বেঁচে আছে। আর জীবন মরণের সন্ধিঃক্ষণে রয়েছেন সামাদ ভাই। পা কাটার কোনো ঘটনার সাথে কোনোটার মিল নেই, তবু কেনো মনে পড়লো, জানি না।

রাত না পোহাতেই টিভিতে দেখলাম, খবরের মানুষটি নিজেই খবর হয়ে গেলেন। মনটা স্বাভাবিক ভাবেই বেদনায় ভিজে গেলো। মনে পড়লো তাঁর সাথে বেশ স্মৃতি। ডানপন্থী অনেক সাংবাদিকদের সাথে আমার মতের মিল নেই, কিন্তু মনের মিল আছে। তাঁদের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক চমৎকার। তাঁরা হলেন- গিয়াস কামাল চৌধুরী, শফিক রেহমান, আমানউদোল্লাহ, আল মুজাহিদী থেকে শুরু করে আব্দুল হাই শিকদার পর্যন্ত। এদের শীর্ষে যাঁর নামটি যুক্ত করতে চাই, তিনি হলেন আতাউস সামাদ। যার সাংবাদিকতার বয়স আমার বয়সের সমান!

প্রথম য ঘটনাটা আজ মনে পড়ছে। সচিত্র সন্ধানীতে ১৯৭৮ সালে নাম নিয়ে একটা কভার ষ্টোরি করি। ‘নামের নামাবলি’ শীর্ষক সেই লেখায় লেখক-সাংবাদিক-শিল্পীদের নাম, ছদ্মনাম, নামের নানান রহস্য নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদনে এক জায়গায় মজা করে লিখেছিলাম- জিয়া হায়দার, রশীদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, জাহিদ হায়দার সহোদর হলেও, সৈয়দ হায়দার তাদের সহোদর নন। হালিম আজাদ আর শামীম আজাদও সহোদর নন। এমন কী অনেকেই শামীম আজাদকে পুরুষ কবি মনে করেন। কিন্তু তা ভুল। আবার অনেকেই আতাউস সামাদের ছোট ভাই মনে করেন সেলিম সামাদকে। আসলে তাঁরাও সহোদর নন।
লেখাটি তিনি খুব উপভোগ করে সন্ধানীর সম্পাদক বেলাল চৌধুরীকে জানিয়েছেন। আমিও খুব আনন্দ পেলাম। সেই থেকে নানা কারণে সামাদের সাথে যোগাযোগ। সে সবপুরানা পল্টন বাসসের নীচে সচিত্র সন্ধানীর অফিসে বসতেন প্রকাশক মনু ভাই, মানে গাজী শাহাবুদ্দিন। আর নয়া পল্টনের এখনকার ‘গাজী ভবনে’র তৎকালীণ একতলায় ছিলো সম্পাদকের কার্যালয়। আমার কুনাকুনি পথে ভেতর দিয়ে নয়া পল্টন থেকে পুরানা পল্টনে আসা যাওয়া করতাম। পথে পরতো সামাদ ভাইয়ের বাসা।

একদিন যাবার পথে দেখি, তিনি বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন। ডাকলেন। গেলাম। চা খেলাম। তখনই তাঁর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হলাম। বললেন, কবিতা লেখা ছাড়া আর কি করো? গ্রামের বাড়ি কোথায়, ইত্যাদি ব্যক্তিগত খবরাদি। আমি বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছেলে, তিনিও। এভাবেই ঘনিষ্ঠতা গাঢ় হয়।

আজ একটি ঘটনা খুব বেশি মনে পড়ছে। এরশাদের সামরিক সাশনের সময় আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাক্ষিক প্রতিরোধে কাজ করি। চারিদিকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তুংগে। তখন আমরা বিবিসি আর ভয়েস আমেরিকা শোনে উত্তেজিত হই। সেই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দু’টি গোপন রিপোর্ট আমার হাতে আসে। একটা প্রেষণে বিভিন্ন সেক্টরে আর্মিদের নিয়োগ, আরেকটা সন্দেহ ভাজনদের তালিকা।

ছুটে যাই সামাদ ভাইয়ের বাসায়। রিপোর্ট দু’টি দিলাম। বললেন, তুমি যে এখানে এসেছো, তোমার তো চাকরি থাকবে না। আমার বাসার আশেপাশে শাদা পোশাকে গোয়েন্দা ঘুরাফেরা করে। তুমি তো গ্রেফতার হয়ে যাবা।
না; আমার চাকরিও যায় নি, গ্রেফতারও হয়নি। তবে ১৯৮৭ সালে এরশাদ তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। কারণ, সেই সময় বিবিসিতে পরিবেশিত তাঁর বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী প্রতিবেদন ছিলো সারাদেশের গণতন্ত্র ও মুক্তিকামী মানুষের হাতিয়ার।

শুধু স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি বিবিসির মাধ্যমে অসীম অবদান রেখেছেন। সাংবাদিকতার জগতে তাঁর নাম চির অম্লান হয়ে থাকবে। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে প্রথিতযশা আতাউস সামাদ একুশে পদক পান।
saifullahdulal@gmail.com