অন্তর্যাত্রা
মীজান রহমান , বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১২


এক

আজকে ছুটির দিন সারা প্রদেশ জুড়ে। রাস্তাঘাট খালি। দোকানপাট বন্ধ। চারদিকে স্তব্ধতার মৃদু গুঞ্জন। এমনকি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে পাখিদের অভ্যস্ত কলকাকলিও শুনতে পেলাম না। ওরাও বুঝি ছুটিতে বেড়াতে গেছে কোথাও, কোথাও কোন অজানা অরণ্যে।
আজকে আমি একা। ছুটির দিনে আমি সবসময়ই একা হই। গোটা পৃথিবীটাই তখন আমার গৃহেতে প্রবেশ করে। অন্তরীক্ষের বিপুল শূন্যতা এসে আমার পাশে বসে। আমরা পরস্পরকে সঙ্গ দিই। মাটিতে ঘাসের শয্যায় প্রতিটি তৃণদল তখন বাঙ্গময় হয়ে ওঠে। রুশ লেখক ভ্লাডিমির নাবুকফ তাঁর নিঃসঙ্গতাকে দুর্বাদের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর সুরের সঙ্গে আমার নিজের সুরটি আশ্চর্যভাবে মি্লে যায়। লোকে বলে, আমি একা একা জীবন কাটাই, আহারে, কতনা কষ্ট! না, আমার একাকিত্ব নিঃসঙ্গতার একাকিত্ব নয়, স্থূল বস্তুর আধারে ভরা একাকিত্ব নয়। আমার একাকিত্ব মৃত্তিকানির্মিত কোনও পাংশু, কাতর কষ্ট জাগায় না। আমার কষ্ট আকাশে আকাশে একাকি পাখির মত ভ্রমণ করে। এ-কষ্ট বৃষ্টিভরা দিগন্তে বর্ণালী রোদ সৃষ্টি করে । আমার কষ্ট সৃষ্টির উল্লাসে চিরচঞ্চল।
গত সপ্তাহের পুরোটাই কাটল পথের ওপর---প্রাণের-অতি-কাছেতে-থাকা তিনটি মানুষের সঙ্গে। তাদের উড়ুক্কু মনের সঙ্গে আমিও উড়াল দিলাম কি জানি কোন্‌ অজানা দ্বীপের খোঁজে। পথকে আমি ভালোবাসি সেটা কারো অজানা নয়। যেখানে যাই সেখানেই পথের প্রতিটি ধূলিকনা আমাকে হাত বাড়িয়ে দেয়---তাদের প্রাণেতে আসন পেতে দেয়। পৃথিবী আমার সাহচর্য পেয়ে ধন্য হয়---এমনই এক অপূর্ব অর্বাচীন ভ্রান্তির সুখে আমি তন্ময় হই। বৃক্ষবন জল পর্বত আমার সঙ্গ নেবার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে।

দুই

ফেরদৌস, মুনির আর মুকুল। তিনটি আশ্চর্য সুন্দর মানুষ। ফেরদৌস নাহার কবিতা লেখে, দেশ-বিদেশে তার প্রচুর সুনাম, ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসঙ্গতার অনুপম নৈঃশব্দকে সে জীবনসঙ্গী হিসেবে বাছাই করে নিয়েছে যৌবনের গোড়াতেই। অল্প বয়সে এতখানি দূরদৃষ্টি কেমন করে পেয়েছিল মেয়েটি জানিনা। বেশির ভাগ মানুষ ভুল করে শেখে। ও শিখেছে ভুল করার আগেই। আমাকে সে ‘মামা’ বলে ডাকে। সাধারণত লোকে ‘ভাই’ ‘চাচা’ বা ‘কাকা’ বলেই সম্বোধন করে আমাকে। আমার দুর্বলতা কিন্তু ‘মামা’র প্রতি---এর একটা কোমল ধ্বনি আছে। ভাই-চাচা-কাকা তিনটেতেই প্রথম অক্ষরটি কেমন কর্কশ শোনায় আমার কানে। শুধু মামাতেই ‘মা’ আছে, যাতে অন্তহীন কোমলতা।
মুনির ফেরদৌসের ভাই---সহোদর নয় যদিও। বুদ্ধি ও চিন্তায় তারা বন্ধু, পরমাত্মীয়। মুকুল ওদের দুজনেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রিয় সহচর। কবিতা লেখে সে’ও। রাশিয়াতে ছিল কুড়ি বছর, রুশ ভাষা ও সাহিত্যে তার অবাধ গতিবিধি, বিস্তর পড়াশুনা বাইরের। তিনজনই দারুণরকম মুক্তমনা। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার নিরাপস সাধক। বৈবাহিক জীবনের স্বাদ এবং বিস্বাদ, দুয়েরই অভিজ্ঞতা হয়েছে মুনির আর মুকুলের। এখন তারা দুজনই বাধাবন্ধনহীন মুক্ত বিহঙ্গ। অশ্ব ছুটিয়ে, ধুলো উড়িয়ে, মুহূর্তের আহ্বানে যেখানে ইচ্ছা সেখানেই চলে যেতে পারে যখন খুশি তখন। তিনটি মুক্ত মানুষের মুক্ত ডাকের ঘূর্ণিতে কেমন করে যেন আমিও জড়িয়ে গেলাম। আমার জীবনও তো ওদেরই মত আইন আর নিয়মের শাসন থেকে মুক্ত। বয়স আমার ভারি হয়েছে জানি, কিন্তু সে-ভার বহন করে শূন্যবিহারী হবার মনটি তো হারাইনি এখনো। আমার মতে বয়স চলবে তার স্বভাবে, আমি চলব আমার স্বভাবে। আমার পথ অনেক আগেই বেঁকে গেছে গতানুগতিকতার সড়ক থেকে।
পথে বেরুবার পর আমি গন্তব্যের কথা ভুলে যাই। না, ঠিক ভুলি না, তবে অবান্তর হয়ে যায় সেটা। তখন পথই আমার গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। আমি চলছি--এবং এই চলাটাই আমার লক্ষ্য। জানি, বাস্তবতার দাবিঃ গন্তব্য চাই। সেই গন্তব্যের বাজারে প্রযুক্তির বণিকেরা কত প্রকারের পণ্য সরবরাহ করেছেন তার সীমা নেই। নবতম পণ্যের নামঃ ‘জিপিএস’---বানান করে বললে দাঁড়ায়ঃ গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম। আধুনিক শকটবিহারীদের পরম বন্ধু---যার উপকারিতা অপরিমেয়। আমি যান্ত্রিক জগতের আধুনিক পর্যটক নই। আমার গাড়িতে যন্ত্রযুগের এই অত্যাশ্চর্য উদ্ভাবনটিকে এখনও স্থাপন করা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ। য়ামি এখনও সেই পুরনো যন্ত্রতে আস্থাবান, যে-যন্ত্র কারখানায় তৈরি হয়না, হয় মাতৃগর্ভে। মরচে-ধরা আমার এই প্রাচীন যন্ত্রটি এখনও পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েনি। জানি, আধুনিক জিপিএস-এর সঙ্গে পাল্লা দেবার ক্ষমতা নেই আমার ক্ষয়িষ্ণু মস্তিষ্কটির, তবুও কোন সফরে বেরুবার কালে আমি এখনও পুরনো দিনের মত ডজনখানেক মানচিত্র সাথে নিই। তাতেই কাজ চলে যায়। কিন্তু বর্তমান যুগের প্রযুক্তিমনা ছেলেমেয়েদের জন্যে জিপিএস চাই। তাই হল এবারের সফরে। গাড়িটা মুনিরের, যন্ত্রটিও ওর, মুকুল তার দক্ষ দিকদিশারী, আমি আর ফেরদৌস, দুটি যন্ত্রভীরু মানুষ, পেছনের সিটে বসে বাইরের চলমান পৃথিবী দেখছি।

তিন

আমাদের প্রথম লক্ষ্ মন্ট্রিয়ল। সেখানে দুরাত কাটানো। আমার ভ্রমণসঙ্গীদের ইচ্ছে, পুরনো মন্ট্রিয়ল দেখা, যেখানে আধুনিক ভাস্করদের আকাশচুম্বী প্রস্তরপ্রাসাদ আর তীব্র আলোর ঝলসানিতে রুগ্ন, আর্ত হয়ে ওঠেনি সভ্যতার প্রাচীন ভিত্তিসমূহ। অতীতের নীরব আভিজাত্যের ছাপ এখনো সুস্পষ্টভাবে বিরাজ করে মন্ট্রিয়লের ফরাসীপ্রধান উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বিস্তৃত এলাকা জুড়ে---যেখানে নটারডেমের গীর্জাধ্বনি তিনশ’ বছর ধরে বেজে চলেছে প্রতিদিন প্রতিঘণ্টায়। সেখানে অত্যাধুনিক যান্ত্রিকতার উপদ্রব পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি এখনো। সেখানে এখনো ঘোড়ার গাড়িতে করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে পারে দূরের আগন্তুক। পুরনো দিনের আধো-আলো-আধো-আঁধার-ভরা ঘরোয়া কফির দোকানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারবেন আপনি জ্যাঁ কার্টিয়ে আর স্যামুয়েল দ্য শ্যামপ্লেনের গল্প করে করে। সুভেনিয়ের শপে গিয়ে দেখতে পাবেন ফরাসীদের বিগত গৌরবের অস্তমিত সূর্যগাঁথা---দেখতে পাবেন কেমন করে সাম্রাজ্যের কুশীলবেরা ক্ষমতার হাতিয়ার ব্যবহার করেছেন পুরাকালে, এবং যা অব্যাহত রয়েছে অদ্যাবধি। এই পুরনো মন্ট্রিয়লে আপনি অলিম্পিক বিল্ডিঙ্গের উত্‌কট আস্ফালন দেখতে পাবেন না, দেখতে পাবেন পুরনো ইউরোপের পদচিহ্ন, শুনতে পাবেন এক পরাজিত জাতির চাপা ক্রন্দনের শব্দ। নটারডেমের প্রতিটি ঘন্টাধ্বনি যেন সেই ব্যথিত অশ্রুবারির ইতিহাসকে বারবার জাগ্রত করে তোলে।
দুটি রাত কাটলো মন্ট্রিয়লে---প্রধানত মনিকা আর রাজার বাড়িতে। রাজার ‘আসল’ নাম হারুন-অর-রশিদ। শুধু রাজা হলেও ক্ষতি ছিল না, সুন্দর মানিয়ে যেত। রাজার মতই ব্যক্তিত্ব তার। মিতভাষী, মিতাচারি, প্রচারবিমুখ---প্রকৃত সজ্জন বলতে যা বোঝায় সে তার জীবন্ত ছবি। উপরন্তু, সযত্নে-গোপন-করে-রাখা তার প্রখর ধীশক্তি---সাধারণ বাঙালি চরিত্রের ঠিক বিপরীত একটি বিনয়নম্র মানুষ। মনিকা তার স্ত্রী। মনিকার কথা শোনেননি বুঝি? ওর গানও শোনা হয়নি? তাহলে আপনার জীবনে একটা অপূর্ণতা থেকে গেল। ও যখন গায় তখন পুরো আকাশটাই নেমে আসে নিচে। পাখিরা চুপ হয়ে যায়---নিসর্গ নিথর হয়। কি এক আশ্চর্য জাদু আছে তার গলায়, তার গানে প্রাণে সুরে, যা মানুষকে অবশ করে ফেলে, তাকে অক্ষম অসহায় অবস্থায় তুলে নিয়ে যায় অন্য কোনও পৃথিবীতে। মনিকা রশিদ প্রকৃতির এক আশ্চর্য কারুকার্য। পাঁচ বছরের আদরিনী কন্যা ঋত্বিকা আর ওরা দুটিতে মিলে এক অনবদ্য নিলয় সৃষ্টি করে রেখেছে মন্ট্রিয়লের শহরতলীতে অবস্থিত পয়েন্ট ক্লেয়ার অঞ্চলে।
সোমবার সকালবেলা রাজা চলে গেল কাজে, ঋত্বিকা গেল তার স্কুলে। মনিকা আর আমরা চারজন মিলে বেরিয়ে গেলাম পুরনো মন্ট্রিয়লের দিকে। মুনিরের জিপিএস’এর যান্ত্রিক রমনীটির কর্কশ কন্ঠের রুক্ষ পরিচালনাতে আমরা নটারডেম বেসিলিকার চত্বরে গিয়ে পৌঁছুলাম বেলা দশটা নাগাদ। গাড়ি পার্ক করা হল কাছাকাছি এক পার্কিং লটে। তারপর পায়ে হাঁটা। সেখানকার রাস্তাঘাট মন্ট্রিয়লের ডাউনটাউনের যানবহুল, জনবহুল, নিত্য বিপদসংকুল রাজপথ নয়---রেনে লেভেক সড়ক থেকে আর্বান স্ট্রীটে ঢোকার সাথে সাথে প্রাচীনতার মুখোমুখি হই আমরা। গীর্জার উঁচু উঁচু গম্বুজ দেখা যায় সেখান থেকেই। আর্বান গিয়ে মেশে এভেনিউ ভিগেরের সাথে। অদূরেই সরুপথ স্যাঁ জ্যাক। সেখান থেকে ডানদিকে মোড় নিলেই রুয়ে নটারডেম। ওখানে প্রকাণ্ড উঠানের মত চত্বর---গাড়িঘোড়ার উপদ্রব নেই, সেখানে পদচারিদের স্বর্গ। অগণিত পর্যটক সেখানে---দেশবিদেশ থেকে আসা নানা জাতের নানা বর্ণের নানা ধর্মের মানুষ। তাদের সবার হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা---ক্যামেরাহীন মানুষ সেখানে বোধ হয় একজনই ছিল। মানুষটিকে আপনারা চেনেন---তার বেশি কি বলার প্রয়োজন আছে? ও হ্যাঁ, মনিকাও ক্যামেরা নিয়ে যায়নি। ফলে আমরা দুজন প্রায় প্রতিটি ছবিতেই উপস্থিত ছিলাম। ছবিতে নিজের চেহারাটির একটা অবাস্তব রূপ দেখলাম। ডিজিটালের দারুণ শক্তি।
কাছেই অনেকগুলো ছোট ছোট দোকান। ওই পাড়াতে সবাই ছোট ব্যবসায়ী---পারিবারিক ব্যবসাই বেশির ভাগ। সেখানে ওয়ালমার্ট নেই, সিয়ার্স, কস্টকো, বে বা লব্লো নেই। সেখানকার কোনও দোকানে ঢুকলে স্বয়ং মালিকের সঙ্গেই হয়ত দেখা হয়ে যাবে আপনার, নতুবা তাঁর পরিবারেরই কেউ-না-কেউ। এমনি এক দোকানে ঢুকল ফেরদৌস আর মনিকা। ফেরদৌসের চোখ ছোট ছোট সুভেনিয়ারের প্রতি যা মন্ট্রিয়লের স্মৃতি ধারণ করে রাখবে। বিশেষ করে চুম্বক যা ফ্রিজের গায়ে এঁটে রাখা যায়। চুম্বক ওকে চুম্বকেরই মত টানে। মনিকার দৃষ্টি কোথায় ছিল জানিনা, হয়ত কোথাও না, আবার সবখানে। ওর নিত্যচপল চোখদুটি কোথায় কখন কিসের টানে নাচতে শুরু করে ঠিক নেই---একটা দুর্ভেদ্য রহস্যের কুয়াষা যেন সারাক্ষণই ঘিরে থাকে মেয়েটিকে। আমরা শুধু দেখতে পেলাম সে দোকানে ঢুকেছে এক পোশাকে, যখন বেরিয়ে এল তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পোশাক।
গীর্জাপাড়ায় যা দেখবার দেখা শেষ করে আমরা রওয়ানা হলাম অদূরবর্তী নদীর ধারে। বড় রাস্তা পার হয়ে চোখে পড়ল একটা পুরনো রেলসড়ক----যেখানে রেলগাড়ি চলে না এখন, চলে প্রেমিকপ্রেমিকারা একে অন্যের হাত ধরে, চলে সেন্ট লরেন্সের আর্দ্র শীতল হাওয়া অতীতের স্মৃতি বহন করে। মরচেধরা এই প্রাচীন রেলসড়কের দৃশ্য আমার যাত্রাসঙ্গীদের মনে রঙ ছড়িয়ে দিল। বিশেষ করে ফেরদৌস আর মনিকা। কবিমন ওদের দুজনেরই। ওরা গুণ গুণ করে গাইল, মনে মনে হয়ত দুচারছত্র কবিতাও রচনা করে ফেলল---কে জানবে কবির মনের কথা। হ্যাঁ, মনিকাও কবিতা লেখে, কবিতার বই বেরিয়েছে রীতিমত। অকবি শুধু আমিই ছিলাম ওখানে। আমার মন তখন বোবা----মেয়েদুটির উচ্ছলতা দেখেই বাকহারা, মুগ্ধ।
এবার সেন্ট লরেন্সের জলের কাছে। জল কেন এমন করে টানে মানুষকে জানিনা। হয়ত নারীর মতই তার রূপ বলে---দূর থেকে তার গভীরতা বুঝবার কোনও উপায় নেই, ওপরের শান্ত শরীর দেখে জানবার উপায় নেই কত অশান্ত স্রোতের ধারাতে বিধৃত তার অন্তর। শুধু তার রূপ, তার চটুল তরলতা মানুষকে ব্যাকুল করে বারবার, তাকে কাজের জগত থেকে তুলে এনে ভাবের জগতে প্রবিষ্ট করে। সেন্ট লরেন্সের তীরে রেলিঙ্গে দাঁড়িয়ে আমরা নৌকাবিহারীদের সখের প্রমোদাগার দেখলাম, দেখলাম পালতোলা সাধের বজরা পরম আলস্যে ভেসে চলেছে নদীর ঢেউএর ওপর। অদূরে বিশাল জাহাজের মত দেখতে কি যেন কি দাঁড়িয়ে আছে কূলের মাটিকে আঁকড়ে ধরে----যেন প্রস্তরযুগের বিপুলাকার কোনও প্রেমিকপ্রেমিকা। ভাল করে তাকালে বোঝা যায় ওটা জাহাজ নয়, জাহাজের আকারে তৈরি দালান---মানুষের কল্পনায গড়া একটি ইঁটপাথরের জলজ রচনা। সেখানে দোকানিদের দোকান আছে সারি সারি, আছে খাবারওয়ালাদের খাবারের পসরা, এমনকি একটা গাড়িপার্কও। নদীর ওপারে দিগন্তের কাছে দারুণ স্পর্ধায় দাঁড়িয়ে আছে মন্ট্রিয়লের অলিম্পিক ভিলেজের সেই বিশাল গোলকটি। আজ থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে এক্সপো সিক্সটিসেভেনে আমি সেই গোলকের ভেতরে-স্থাপিত এক প্রমোদশকটে চড়ে আকাশে আকাশে বিচরণ করেছি। যতবার সেই গোলকটি দেখি ততবারই ভাবি ওই সময় আমার বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়। ত্রিশের কোঠায়! ভাবতেই অবাক লাগে। আজকে যাদের বয়স ত্রিশ তারাও একদিন আমার আঙ্গিনায় এসে পৌঁছুবে। তখন কি তারা একই মানুষ থাকবে? না থাকবে না। এই নদীর মতই সেই জল কোন্‌ সুদূর সাগরের নীল জলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাবে।
দিনের আলো আস্তে আস্তে তামাটে হয়ে আসছিল---নদীর বাতাসে ঠাণ্ডা আমেজ। ওরা তড়িঘড়ি করে আরো অনেক ছবি তুলল----আমার ছবি, মনিকার ছবি, ওদের নিজেদের ছবি, পরস্পরের ক্যামেরাতে, পরস্পরের শৈল্পিক খেয়ালখুশিতে। ধন্য তুমি ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভাবলাম মনে মনে। তুমি আছ বলে কাউকে ভাবতে হয়না ফিল্ম শেষ হয়ে যাবে কিনা। ফিল্মের বালাই চুকে দিয়েছে এই আশ্চর্য যন্ত্রটি। এই যন্ত্রের জনক সেই বিশাল প্রতিভাধর মানুষটি কে কেউ কি মনে রেখেছে? ভদ্রলোকের নাম স্টিভেন স্যাশন, আমেরিকান প্রকৌশলী, ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানিতে নিযুক্ত থাকাকালে এই অসাধারণ যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন ১৯৭৫ সালে, যখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ। আজকে যখন পৃথিবীর কোনায কোনায় কোটি কোটি মানুষ কোটি কোটিবার বোতাম টিপে সখের ছবি তুলে যাচ্ছে মনের আনন্দে তারা কি কখনও জানতে চেয়েছে লোকটার নাম? না চায়নি। সৃষ্টি যখন পণ্যতে পরিণত হয় স্রষ্টার নামটি তখন কারুর মনে থাকে না। মনে রাখার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করে না কেউ।
আমার বৃদ্ধ শরীরে ক্লান্তির ছায়া পড়ছিল একটু একটু করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা কেবল পায়ে পায়ে থাকা---আমার বয়সে তেমন সয় না। বারবার বেঞ্চিতে বসে দম নিচ্ছিলাম। ওদের সবারই তরুণ বয়স। আমি যদি সঙ্গে না থাকতাম তাহলে ওরা হয়ত আরো অনেক সময় নিয়ে ঘুরে বেড়াতো সেখানে। আসন্ন সন্ধ্যার মিষ্টি সজল বাতাস আমার সমস্ত শরীরে মনে অলস তন্দ্রা মেখে দিচ্ছিল, আর ওদের প্রাণে হয়ত বাজিয়ে তুলছিল সাঁঝের বেলার শঙ্খধ্বনি। তবুও বলতে হল, চল যাই। ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। ক্ষিদেও মন্দ পায়নি।


চার

মঙ্গলবার সকালবেলা হাইওয়ে চল্লিশ ধরে আমাদের যাত্রা শুরু কিউবেক সিটির দিকে। সাড়ে তিন ঘন্টার পথ দুপুর না হতেই পৌঁছে গেলাম। নিশাযাপনের একটি জায়গা ওরা আগেই ঠিক করে রেখেছিল আন্তর্জাল ঘাঁটাঘাঁটি করে। এক ভাঙ্গাচোরা সরু গলির মত রাস্তার ধারে অবস্থিত ঠিকানাটিতে বেল টিপে বুঝলাম বাড়িতে কেউ নেই। অদ্ভুত কাণ্ড----বিজ্ঞাপনে পরিষ্কার লেখা বেড-এণ্ড-ব্রেকফাস্ট, অথচ লোকজন কেউ নেই, এ কেমনতরো ব্যবসা! আমি একা হলে হয়ত হতাশ হয়ে শহর থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতাম, কিন্তু আধুনিক যুগের যন্ত্রকুশল মানুষ এই সামান্য বিপর্যয়ে দমে যাবার পাত্র নয়। সেলফোন আর ইন্টারনেট দিয়ে আরেকটা বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেলল তারা গাড়িতে বসেই---যন্ত্রের সঙ্গে এমন সহজ মিতালি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা গেল না। আমার সময় আসলেই ফুরিয়ে গেছে।
জায়গাটির নাম খাঁটি ফরাসী ভাষায়----স্বাভাবিক, কিউবেক সিটি হল প্রদেশের রাজধানী, ফরাসী কৃষ্টির জীবন্ত প্রদর্শনী। এখান থেকে শুরু হয়েছিল উত্তর আমেরিকার ফরাসী সম্প্রদায়ের প্রথম অভিবাস---ইতিহাসের ক্রূর চক্রটির সামান্য হেরফের হলে হয়ত আজকে গোটা মহাদেশটি ইংরেজীভাষি না হয়ে ফরাসীভাষি হয়ে যেত। যাই হোক আমাদের নবলব্ধ বেড-এণ্ড-ব্রেকফাস্ট জায়গাটির নাম, যতদূর মনে করতে পারছি, লা’আর্ডিন। একেবার বড় রাস্তার ধারে---সুন্দর ছিমছাম পরিপাটি করে সাজানো একটি চার-ঘর বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠান। বেল বাজাতেই এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা হাসিমুখে দরজা খুলে দিলেন।
ভদ্রমহিলা তাঁর নাম বললেনঃ মিরায়েল। এমনভাবে উচ্চারণ করলেন নামটি যে আমার অনভ্যস্ত জিভে দুতিনবার চেষ্টা করেও আয়ত্তে আনতে পারলাম না--- ওরা ‘র’অক্ষরটি উচ্চারণ করে ‘ঢ়’ আর ‘খ’ এর মাঝামাঝি একটা গাঢ় ধ্বনিতে---যা চট করে শেখা সহজ নয়। মিরায়েলের সঙ্গে টাকাপয়সার হিসেব চুকানোর পর তাঁর স্বামী সার্গে (ওই নামটিও অফরাসীভাষিদের জন্যে প্রায় অননুকরণীয়) এলেন আমাদের ঘরগুলো দেখিয়ে দেওয়ার জন্যে----একটিতে মুনির আর মুকুল, আরেকটি ফেরদৌস আর আমার জন্যে। প্রকাণ্ড বিছানা----মাঝখানে ভাগ করা সম্ভব ছিল বলে রক্ষা। চারটে ঘরের ভাড়াতেই ওদের সংসার চলে, অনুমান করলাম, সবগুলোই দোতলাতে, এবং অত্যন্ত রুচিসম্পন্নভাবে সাজানোগুছানো। একেকটি ঘরের দরজায় একেকজন বিখ্যাত ফরাসী শিল্পীর নাম----ভ্যান গো, ডেগা, মোনে, রেনোয়া। শুধু তাই নয়, নাম অনুযায়ী সেত-ঘরের ভেতর মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর সেই শিল্পীর জীবনবৃত্তান্ত সম্বলিত বড় আকারের গ্রন্থ। বোঝা গেল এঁরা দারুণ শিল্পানুরাগী মানুষ। শিক্ষিত ফরাসীরা সাধারণত তাই হয়। এরা কালচারসচেতন জাতি---আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান শিল্পসাহিত্যের ইতিহাস বলতে গেলে এরাই রচনা করেছেন, অন্তত ঊনবিংশ আর বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে একটা সময় ছিল যে প্যারিসে না যাওয়া পর্যন্ত শিল্পকলার কারো পক্ষেই বিশ্বজোড়া সুনাম অর্জন করা সহজ ছিল না। আমাদের বেড-এণ্ড-ব্রেকফাস্টের এই সাধারণ যুগলটিও তেমন সাধারণ ছিলেন না, তার স্বাক্ষর সর্বত্র। প্রতিটি ঘর (এমনকি খাবার ঘরটিও) বড় বড় শিল্পীদের আঁকা ছবি দিয়ে অলঙ্কৃত। প্রতিটি ঘরের প্রতিটি আসবাব, প্রতিটি টেবিলে, প্রতিটি মেঝেতে দেয়ালে পর্দায় উঁচুমানের রুচিশীলতার ছাপ। আমরা চারজন বিমোহিত বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। এ কোথায় এলাম আমরা? এ তো ছোটখাটো হোটেল নয়, রীতিমত একটি আর্ট মিউজিয়াম। জিজ্ঞেস করে করে আরো জানলাম, মিরায়েল নিজেও ছবি আঁকতেন একসময়, শিক্ষকতা করেছেন স্কুলে, এবং তাঁর স্বামী ছিলেন সরকারি বেতনভোগী ভূতাত্বিক প্রকৌশলী, পুরো সাত বছর তুন্দ্রা অঞ্চলে খনিজবিষয়ক গবেষণাকর্মে লিপ্ত ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত মানুষ, এবং প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী, আলাপে আলাপে বোঝা গেল। উপরন্তু ওঁরা দুজনই অসম্ভব ভদ্র, অমায়িক, রসবোধসম্পন্ন প্রাণবন্ত মানুষ। মনে হল আমাদের কিউবেক আসাটা এতেই সার্থক হয়ে গেছে।
মন্ট্রিয়ল থেকে বেরুবার সময় মাথার ওপর জুলাইর প্রখর সূর্য ছিল---কিউবেক শহরে ঢোকার আগেই শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। সারা দিন সারারাত্ ধরে অবিরাম বর্ষালো সে-বৃষ্টি। বড় আশা করে এসেছিল ওরা---ফেরদৌস, মুকুল আর মুনির। কিউবেক সিটির প্রচণ্ড আকর্ষণ ওদের শিল্পীমনে----ফেরদৌস আসলে কবিই নয় কেবল, শিল্পীও, একক প্রদর্শনী কখনো হয়েছে কিনা জানিনা, কিন্তু প্রদর্শনীযোগ্য ছবি যে সে আঁকে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। বাকি দুজন ছবি আঁকে কিনা জানিনা, কিন্তু ছবির ইতিহাস ভাল করেই জানা তাদের, ইউরোপীয় সভ্যতার ধারাবাহিকতার সঙ্গে তারা বেশ পরিচিত। সে কারণেই তাদের কিউবেক ভ্রমনে আসা। আমি নিজে শিল্পী নই, শিল্পকলা বুঝিও না তেমন, তবে ভাল লাগে যখন উন্নতমানের শিল্পকাজ দেখি। কিউবেকে আমি দুবার এসেছিলাম আগে। একবার সপরিবারে, নিজের উদ্যোগে, দ্বিতীয়বার গণিতের অধিবেশন উপলক্ষে। আমার মোটামুটি সবই দেখা কিউবেক শহরে। নতুন কিছু দেখার নেই এখানে। তবুও কিউবেক শহরের মত প্রাচীন শহর এখনো তার নতুনত্ব হারায়নি, আমার মতে। দৃশ্য হয়ত বদলায় না সময়ের সঙ্গে, কিন্তু মানুষের চোখ বদলায়---তাতে করে আমরা পুরাতনের মধ্যে নিজেকেই আবিষ্কার করি বারবার।
বৃষ্টিতে শরীর যেমন ভিজল খানিক, তার চেয়ে বেশি ভিজল মন। তবুও আমরা বেরিয়ে গেলাম গাড়ি নিয়ে। কিউবেক সিটির অন্যতম আকর্ষণ, চারদিকের দেয়াল---সবটা শহর নয়, শুধু পুরনো সীমানাটুকুই। এবং পুরনো শহরটিই বাইরে-থেকে-আসা পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। প্রাচীন ইতিহাস এবং চাঞ্চল্যময় নতুন জীবনের সংমিশ্রণ হয়েছে সেখানেই। প্রাচীন তার প্রাচীন আভিজাত্য বজায় রেখেছে, নতুন রেখেছে নতুন যুগের দৃপ্ত পদচারণার স্বাক্ষর। সরু সরু রাস্তা, নিচু নিচু বাড়িঘর, পথের ধারে চাঁদোয়ার ছায়াতে চা-কফির দোকান---অনেকটা প্যারিসের রাস্তাঘাটেরই মত, ছোট ছোট দোকান রাস্তার দুধারে, মেড-ইন-চায়না দ্রব্যাদিতে বোঝাই সব, স্থানীয় সুভেনিয়ার শতপ্রকারের। জায়গায় জায়গায় বাচ্চাদের প্রমোদোদ্যান, খেলাঘর, নানা রঙের বেলুন, প্রাচীন কোনও ভাস্করের তৈরি মূর্তি, পুরনো বইয়ের দোকান, কিউবেকের চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবির দোকান, আরো কত কী। টুরিস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত পসরা সেখানে অন্তহীন। সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব নয় দু’দিনের পর্যটকের। তার ওপর বৃষ্টি। অবিরাম, অনবরত বৃষ্টি। সারা সপ্তাহ গেল বৃষ্টিবিহীন শুষ্কতায়, কিউবেকে এলাম দুচোখ ভরে তৃষ্ণা মেটাতে, তখনই নামল বৃষ্টি। একটা রেস্টুরেন্টে বসে খেয়েদেয়ে আমরা ফিরে এলাম হোটেলে। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। আমার শরীর বলল, এবার রেহাই দাও বাপু, ঢের হয়েছে ঘোরাঘুরি, বয়সটা ভুলে যেও না যেন। বৃষ্টি তখনো পুরোদমে, তার ওপর বাতাস, ঝাপটা উড়ো বাতাস। বাইরে যাবার মত আদর্শ আবহাওয়া নয়। মনে করেছিলাম ওরাও আমার মত ঘরের নিরাপদ আরামটুকুই বাছাই করে নেবে। ভুল। যৌবন কি কখনো ঝড়তুফানের তোয়াক্কা করে? বৃষ্টি হচ্ছে হোক---তাতে কি আসে যায়? যৌবনে আমিও ঠিক একই কাজ করেছি। বৃষ্টিতেই বরং বেশি চঞ্চল হয়ে উঠত আমার মন---হিতাহিত না ভেবে বেরিয়ে পড়তাম বাইরে। বৃষ্টিতে ভেজার মত আনন্দ কি আছে আর কিছুতে? ওরা বেরিয়ে গেল গাড়ি নিয়ে। আমি বাথরুমের গরম পানিতে গোসল করে গা এলিয়ে দিলাম নরম বিছানায়।
পরের দিন সকাল সকাল নাস্তা খেয়ে আমি মিরায়েল আর সার্গের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিয়েছি, তখন ওরা একে একে নেমে এল ওপর থেকে। শোনালো ওদের নৈশবিহারের বৃষ্টিস্নাত গল্প। ভিজে ভিজেই ওরা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বিশাল পর্দায় আলোর খেলা দেখেছে। দেখেছে আরো অনেক আলো-ঝলমল দৃশ্য, তামাশা, যা টুরিস্টদের জন্যে সবসময়ই তৈরি করে রাখে তারা। ভাগ্যিস আমি ওদের সঙ্গে যাইনি, তাহলে ঠাণ্ডা লেগে নির্ঘাত্‌ নিমোনিয়া হয়ে যেত। আমার বয়সে এই রোগটি সবসময়ই যেন সুযোগের অপেক্ষায় থাকে---ফাঁক পেলেই বাঘের মত লাফিয়ে পড়ে।
মাঝসকালে আমরা আবার পথে। এবারের লক্ষ্ বে সেন্ট ক্যাথেরিন---প্রায় চার ঘন্টার পথ। আমি যাইনি কোনদিন, সুতরাং একটা কৌতূহল ছিল দেখবার।


পাঁচ


মন্ট্রিয়ল থেকে কিউবেক সিটির সড়কটুকু মোটামুটি ভালোই----যেরকম হওয়া উচিত। দুভাগে বিভক্ত প্রশস্ত রাজপথ। কিন্তু কিউবেক থেকে বে সেন্ট ক্যাথেরিনের রাস্তাটি বিভক্ত নয়, চারলেনের রাস্তা একটা হলদে রঙের রেখা দিয়ে দুভাগে ভাগ করে রাখার চেষ্টা। অনেক পাহাড়ি জায়গায় সেটা সরু হয়ে মাত্র দুটো লেন হয়ে দাঁড়ায়। খাড়া পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে গাড়ি চালানো তখন রীতিমত আতঙ্কের ব্যাপার। মুনির খুব দক্ষ চালক---দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা তার, চালিয়ে চালিয়ে ঘাঘু হয়ে গেছে। আমরা নিশ্চিন্তে আরাম করে বসে চারদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করে গেলাম----দুচোখ ভরে পান করলাম দুপাশের মৌন পর্বতমালার অপরূপ রূপের পসরা।
ঘন্টাতিনেক পর লাঞ্চবিরতির সময়। বে সেন্ট পল নামক একটি ছোট শহর চোখে পড়াতে সেখানে একটা কিছু খেয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এখানে থামব বলে কোনও পূর্বপরিকল্পনা আমাদের ছিল না। কিউবেকের সেই বেড-এণ্ড-ব্রেকফাস্টের শিল্পমনা মহিলাটি খুব গুণগান করছিলেন শহরটি্র----এটি নাকি কিউবেকের চিত্রকলাশিল্পীদের তীর্থস্থান। গ্রীষ্ম-শীত-বর্ষা সব ঋতুতেই নাকি শিল্পীরা দলে দলে চলে আসে সেখানকার প্রকৃতির কাছে বসে ছবি আঁকার জন্যে---আকাশ-পাহাড় আর হ্রদ-নদীতে মিলে প্রকৃতি এক অনবদ্য পটভূমি তৈরি করে রেখেছে সেখানে। শিল্পী কেবল নয়, দেখলাম, সাধারণ মানুষদের জন্যেও ক্যামেরা নিয়ে ঘন ঘন ছবি তুলবার মত সত্যিকার আদর্শ জায়গা----গোটা শহরটাই যেন নীল আকাশের গায়ে এঁটে-থাকা বিরাট এক তৈলচিত্র। সারা শহরে ছড়ানো ছিটানো অগণিত আর্ট গ্যালারি---নতুন-পুরাতন শিল্পীদের আঁকা ছবি বেচাকেনা হচ্ছে। ক্রেতা-বিক্রেতার অভাব দেখলাম না কোথাও। গোটা শহরটাই যেন একটা আর্ট গ্যালারি। লাঞ্চ খেতে ঢুকলাম একটি সাধারণ ছোটখাটো রেস্টুরেন্টে, সেখানেও দেয়ালে দেয়ালে শিল্পীদের মৌলিক ছবি টাঙ্গানো। বে সেন্ট পল আমাদের ভ্রমনসূচীর ভেতরে ছিল না বটে, কিন্তু ভ্রমনশেষে এর স্মৃতিটাই যেন সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে আমাদের মনে।
লাঞ্চের পর ঘন্টাখানেক ডাউনটাউনের দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি করে আমরা আবার পথে নামলাম। এবারের গন্তব্য পাহাড় আর নদীমোহানার মিলনস্থলে অবস্থিত ছবির মত ছোট শহর লা মেলবেল। এর খবরও আগে জানা ছিল না আমাদের কারুরই। খবর দিলেন সেই একই মহিলা---বেড-এণ্ড-ব্রেকফাস্টের মিরায়েল। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ প্রায় আশি কিলোমিটার, বে সেন্ট পল থেকে লা মেলবেল। মিরায়েলের তথ্য অনুযায়ী সেখানে যাবার দুটি পথ---নদীর ধার দিয়ে, অপেক্ষাকৃত সমতল রাস্তা, তবে বেশ ঘুরতি। দ্বিতীয়টি পাহাড়ি রাস্তা---ঢেউ খেয়ে হেলে দুলে চলার মত উঁচুনিচু পথ। অনেকটা সামুদ্রিক জাহাজ ঝড়ো সমুদ্রে মাতালের মত টলতে টলতে চলার মত। সাবধানে চালাতে হয় গাড়ি সেখানে, তবে দূরত্ব কমে, বড় কথা দুপাশের মন-কেড়ে-নেওয়া দৃশ্য। আমরা প্রাণভরে প্রকৃতির সেই অনন্য রূপসম্ভার উপভোগ করলাম। বেচারি মুনিরই কেবল গাড়ি চালাচ্ছিল বলে তার স্বাদ পুরোপুরি গ্রহণ করার সুযোগ পায়নি---পাহাড়ি রাস্তায় গাড়িচালকদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।
লা মেলবেলে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা দরকার। খানিকটা গ্রাম গ্রাম আবহাওয়া সেখানে। সূর্য ডোবার সাথে সাথে যেন গোটা পরিবেশটাই ঘুমের দেশে চলে গেল। জনবিরল থমথমে রাস্তা----মাঝেমধ্যে দূরাগত টুরিস্টরা দিশেহারা, পথভোলা পথিকের মত উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘোরাঘুরি করছেন। অদূরে উপসাগরের শান্ত জল চুমু খেয়ে যাচ্ছে উপকূলের কাদামাটিকে। গুটিকয় কিশোর-কিশোরি পথপার্শ্বের সরু হাঁটা পথটিতে স্কেটবোর্ডিং শিখছে। হোটেলমোটেলের ছড়াছড়ি রাস্তার ধারে। টুরিস্টদের প্রিয় জায়গা বোঝা গেল। হবেই। এপাশে পাহাড়, ওপাশে সেন্ট লরেন্স বিশাল আকার ধারণ করেছে, এদিকে মাঝখান দিয়ে হঠাত্‌ করে কোথা থেকে উদয় হয়েছে নাম-না-জানা এক কৃষ্ণবর্ণ স্রোতস্বিনী। সব মিলিয়ে এক গা ছিমছিম করা স্তব্ধ নিথর পরিবেশ। চারদিকে চিরগতিশীল প্রকৃতি অনন্তের পথে নিত্য ধাবমান। অথচ মেলবেলের সাগরপারে দাঁড়িয়ে কেমন যেন মনে হল এখানে গতির একটা অদ্ভুত স্থিতিশীল রূপ আছে যা অন্য কোথাও দেখিনি। বা দেখেছি, লক্ষ্ করিনি, বুঝিনি যে আসলে গতির স্থিতিশীলতাই প্রকৃতির একান্ত আপন রূপ।
হাইওয়ের ঠিক পাশেই সুন্দর একটা মোটেল পাওয়া গেল। কি যেন নাম মোটেলটার, খাঁটি ফরাসী নাম, মনে করতে পারছিনা। কি’ই বা আসে যায় নামেতে। অনেকটা উঁচু জায়গাতে, ছবির মত নিটোল করে সাজানো সবকিছু। ঝলমল রূপালি আলোর ঝালড়ে কেমন অবাস্তব মনে হচ্ছিল----কালো আকাশ থেকে নিষ্প্রভ তারাগুলো তাকিয়ে থাকল আমাদের দিকে, স্বাগতম জানালো নিঃশব্দে।
মোটেলে একসারি পাশাপাশি ঘর ছাড়াও অতিথিদের জন্যে বেশ ক’টা কটেজ ছিল সারা প্রাঙ্গন জুড়ে। প্রতিটি কটেজে দু’টি শোবার ঘর, একটা কিচেন-ও-বসার ঘর, টিভি, গোটাদুই সোফা---ভদ্রভাবে থাকার মত মোটামুটি সব ব্যবস্থাই ছিল সেখানে। ফেরদৌস আর আমি থাকলাম এক কটেজে, মুকুল-মুনির দু’বন্ধুতে মিলে আরেকটিতে। কটেজে ঢুকে বহুকাল আগেকার দৃশ্যগুলো সেই কৃষ্ণকায় বিষন্ন স্রোতস্বিনীর মতই কুলকুলধারে বয়ে এল আমার স্মৃতিডোরে। আমার নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে প্রথম যেদিন পা দিই ক্যানাডার মাটিতে সেদিন আমার বিভাগীয় অধ্যক্ষ ঠিক এমনি এক কটেজে রেখে এসেছিলেন আমাদের, নিজেদের বাসা না পাওয়া পর্যন্ত যাতে থাকতে পারি। তার আগে ‘কটেজ’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থ যেটা জানা ছিল আমার, মানে কুটির, অর্থাত্‌ যেখানে গরিবদুঃখিরা থাকে ভালো বাসাবাড়ি ভাড়া করার সামর্থ নেই বলে। এদেশে এসে দেখি উলটো ব্যাপার। কটেজ হল পয়সাওয়ালদের বিনোদনের জায়গা, যেখানে তারা গ্রীষ্মের গরমে কটেজের গ্রামীন শ্যামলিমাতে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটিয়ে আসতে পারে। অতিশয় ব্যস্ত বড়লোকদের অতিপ্রয়োজনীয় বিশ্রামের ছায়াকুঞ্জ। অথবা আমাদের মত মধ্যবিত্ত দূরের পথিক, একটু ঘুম, একটু বিশ্রাম----তার বেশি সামর্থ বা প্রয়োজন আমাদের নেই। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম। পঞ্চাশ বছরের সেই পুরনো স্মৃতি কেমন করে যেন দেয়ালছবির মত আবির্ভূত হল আমার চোখের সামনে। সূক্ষানুসূক্ষ প্রতিটি দৃশ্য মানসপটে ভাসছে ঠিক যেমনটি ছিল তখন, অবিকল সেই মূর্তিতে। কি আশ্চর্য, ভাবলাম মনে, এতকাল আগের ঘটনার আদ্যোপান্ত সব নিখুঁতভাবে জমা আছে মনে মনিকোঠাতে, অথচ দুদিন আগে কি ঘটেছে আমার নিজের জীবনে কিছুই মনে করতে পারছিনা। স্মৃতির পথটি এমন আঁকাবাঁকা কেন বলুন তো।
কথা ছিল, মেলবেলে রাত কাটিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব বে সেন্ট ক্যাথেরিনের পথে। কিন্তু মেলবেলের সেই মেঘলা রাতের সজল বাতাসে কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল প্ল্যান-পরিকল্পনা। সেন্ট ক্যাথেরিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল সেখানে প্রকৃতিকে দেখব তার আদিম নগ্ন রূপে। কিন্তু এই যে এত এত ঢেউ-খেলা পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে এলাম, এই যে এত ছোট ছোট নদীনালা আর বড় বড় সমুদ্রগামী নদী আর হ্রদ-পর্বত মিলে আদি অন্তহীন নীরব প্রকৃতি চারিদিকে রচনা করে রেখেছে এক বিচিত্র রঙ্গমঞ্চ, এই যে অনন্ত আনন্দমেলাতে চিরনিমগ্ন ধরাপৃষ্ঠ মন-পাগল-করা আবহসুরে ভরে রেখেছে পুরো বায়ুমণ্ডল, তাতেই তো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল পাত্র। আর কি প্রয়োজন আছে পথকে প্রসারিত করা? প্রকৃতি কথনও ক্লান্ত হয়না, জানি, কিন্তু আমরা হই। বিশেষ করি আমি। বয়স আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, হে মূর্খ পথিক, ভুল তো অনেকই করেছ জীবনে, আর সময় নেই তোমার তা শুধরাবার। বেলা প্রায় ডুবে গেল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আমরা এবার ফিরতি পথে রওয়ানা হব। ক্লান্তি আর তৃপ্তি দুয়ে মিলে সামনে চলার উদ্যমকে ঝিমিয়ে ফেলেছে।


ছয়

সকাল আটটায় আমরা রওয়ানা হলাম ফেরার পথে। এবার গাড়ির চাকা আমার হাতে। বয়স আমার হয়েছে বটে, তবে অভিজ্ঞতাও, মানে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা, নেহাত্‌ কম হয়নি---প্রায় পঞ্চাশ বছর। তাছাড়া এখনও দিশাটিশা পুরোপুরি হারাইনি, সেটা ওরা বোঝে, তাই আমার হাতে গাড়ির দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সম্ভবত ওদের খুব একটা বুক্ ধুকধুক করেনি। গাড়ির মালিক মুনির যদি কিঞ্চিত্‌ নার্ভাস বোধ করে থাকে মনে মনে, সেটা অন্তত ভদ্রতার খাতিরে হলেও, চেপে রেখেছিল সুন্দর করে।
ঘন্টাখানেকের মাঝেই আমরা পৌঁছে গেলাম বে সেন্ট পলে। আবার সেই স্বপ্নিল শহর যেখানে লাঞ্চ খেতে গিয়ে মনে হয়েছিল পুরো শহরটাই একটা আর্ট গ্যালারি---শিল্পীদের স্বর্গ। এর চৌম্বিক আকর্ষণ আবারও আমাদের টেনে নিল সেখানে। আগেই ঠিক করে রেখেছিল ওরা যে ওখানে ঘন্টাখানেক থেমে সকালের নাস্তাপর্বটা সেরে ফেলবে---নাস্তাটা আসলে ছুতোমাত্র, মূল উদ্দেশ্য অসম্ভব ভালো-লাগা একটা জায়গাতে আরো একটুখানি সময় কাটিয়ে যাওয়া। তারপর সোজা কিউবেক শহর। ওখানে পৌঁছুলাম বেলা একটার দিকে। এবার একেবারে মেঘমুক্ত নীল আকাশ। কড়া রোদ, গ্রীষ্মের ফাঁপা গরমে সেদ্ধ হবার মত অবস্থা আমাদের। তবুও ওদের চোখেমুখে বাঁধভাঙ্গা উত্তেজনা। বৃষ্টির কারণে প্রথমবার তো কিছুই দেখা হয়নি, এবার সেটা পূরণ করে নেবে ওরা। আমি কড়া রোদ খুব একটা সহ্য করতে পারিনা আজকাল, ওদের মত সহজে উত্তেজিত হয়ে ওঠারও বয়স পার হয়ে গেছে অনেক আগে। তবুও অস্বীকার করতে পারব না যে ওদের স্বতস্ফূর্ত আনন্দের জোয়ারে আমিও খানিক আন্দোলিত না হয়ে পারলাম না। সোত্‌সাহেই যোগ দিলাম ওদের সাথে। মুনির তার গাড়িখানি পার্ক করে নিল সেন্ট লরেন্সের ধারে বেশ বড়সড় এক পার্কিং লটে। জায়গাটা ওর বেশ পরিচিতই মনে হল---দুবছর আগে নাকি এসেছিল একবার। আমিও যে যাইনি সেখানে তা নয়, তবে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে, যখন ছেলেরা স্কুলে পড়ত, এবং ওদের মা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার শক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেনি। সেসব দিন কখন যে হারিয়ে গেল টেরই পেলাম না। আজকে সেই একই জায়গাতে দ্বিতীয়বার গিয়ে মনে হল কিছুই চিনিনা আমি, একটি দুটি দালান, আর যে হোটেলটাতে আমরা একটা রাত কাটিয়েছিলাম, সেটি ছাড়া। হোটেলটার দিকে তাকিয়ে ছোট একটা ঢেউ আলতো করে দোল খেয়ে গেল মনে, সেটা চেপে রাখলাম। কি দরকার হৃদয়ের পুরনো ক্ষতগুলো লোকের সামনে উদোম করে ফেলা।
নদীপারের সেই পার্কিং লট থেকে একটু হাঁটার পরই বোঝা যায় পুরো জায়গাটাই এখন টুরিস্টদের দখলে চলে গেছে। সুভেনিয়েরের দোকানে ছেয়ে গেছে চারদিক। কিলবিল করছে মানুষ। নানারঙ্গের পোশাক, বা প্রায় পোশাকবিহীন----জুলাই মাসের তাতানো রোদে এদেশে সবই চলে। নানা ঢঙ্গের খেলা দেখিয়ে পয়সা রোজগারের ফিকিরে আছে পেশাদার কেউবা। একজনকে দেখলাম ক্লাউন সেজে চাঁদা তুলছে কুমারি মেরির আরাধনামন্দিরের মোটা তহবিল আরো মোটা করার মহত্‌ উদ্দেশ্য নিয়ে। কারো মুখে বিন্দুমাত্র কষ্ট দুঃখ অভাব আর মন-খারাপ-লাগা ভাবের লেশমাত্র নেই। এখানে বাস্তব মানুষ অবাস্তবের সঙ্গে খেলা করে। এমনকি রাস্তার ধারে খালি পাত্র ধরে বসে থাকা দুটি খুচরো পয়সার কাঙ্গাল, তার চেহারাতেও কোনও বিষাদের চিহ্ন নেই। এদেশের গ্রীষ্মে অবারিত সুখও সংক্রামক হয়ে পড়ে।
এসব আমরা আগেও দেখেছি---খুব একটা আকর্ষণ আর নেই এখন। সময় কম, অতএব যা দেখিনি আগে, অন্তত ফেরদৌস আর মুকুল দেখেনি, আমরা সেদিকেই রওয়ানা হলাম। এবং আসল দেখবার জায়গা সেখানেই। এই হালকা ফূর্তির বাজার থেকে ভিন্ন জায়গায়। সেখানে যেতে দুভাবে যাওয়া যায়---খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় হৃদপিণ্ডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে হাঁপাতে হাঁপাতে যাওয়া, অথবা আমাদের মত ভীরু বাঙ্গালিরা যা করে সাধারণত, পকেটের গোটাদুই ডলার খসিয়ে আরাম করে লিফটে চড়ে যাওয়া। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন পাঠক আমরা চারটিতে কোন্‌ পন্থাটি বাছাই করেছিলাম।
লিফট থেকে বেরুলেই এক বিশাল চত্ত্বর----কিউবেক প্রদেশটির মূল ইতিহাসটিই যেন তুলে ধরা হয়েছে সেখানে, গুটিকয়েক প্রতীক-প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। প্রাদেশিক রাজধানী কিউবেক শহরের প্রতিষ্ঠাতা স্যামুয়েল দ্য শ্যামপ্লেনের প্রকাণ্ড মূর্তি সগর্বে দণ্ডায়মান চত্ত্বরটির ঠিক মধ্যিখানে। অদূরে প্লেইন অফ আব্রাহামের স্মৃতিফলক। (জায়গাটির অফরাসী নামকরণের কারণ এটির মালিকানা তখন ছিল আব্রাহাম মার্টিন নামক এক ভদ্রলোকের) এই ফলকটির মর্ম হয়ত বহিরাগত পর্যটকদের বোধগম্য হবে না ইতিহাস না জানা পর্যন্ত। কিন্তু প্রতিটি ফরাসী জাতীয়তাবাদী কিউবেকুয়ার প্রাণের গভীরে এই ফলক একাধারে জাতীয় গৌরব ও অপরিমেয় বেদনার স্মৃতি বহন করে। ১৭৫৯ সাল পর্যন্ত গোটা কিউবেক প্রদেশটিই ছিল ফরাসী শক্তির দখলে----সেসময় এর নামই ছিল নিউ ফ্রান্স। পুরো সাত বছর উত্তর আমেরিকার দখলিসত্ত্ব নিয়ে দুই জাতির মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে---কোথাও এপক্ষ জেতে কোথাও ওপক্ষ। চূড়ান্ত হারজিতের মীমাংসা ঘটে এই আব্রাহামের যুদ্ধে। ব্রিটিশ সেনাপতি জেমস ওলফ্‌ চালাকি করে একটানা তিনমাস এই নদীবন্দরটিকে আটক করে রাখেন যাতে শত্রুপক্ষের কোনও জাহাজবোঝাই জনবল বা মালামাল আমদানি না হতে পারে। ফরাসীপক্ষের সেনাপতি ছিলেন এক অসমসাহসী যোদ্ধা মারকি দ্য মন্টক্যাম। তিনি এবং তাঁর পরিচালিত বীর সৈন্যবাহিনী আমরণ যুদ্ধ করে গেলেন মাতৃভূমিকে আগ্রাসী ব্রিটিশ শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু শেষরক্ষা সম্ভব হল না, প্রধানত জেনারেল ওলফের সেই অবরোধ কৌশলটির কারণে। সেই যে মার খেল ফরাসী পক্ষ সেই ঘা থেকে তারা আর সামলে উঠতে পারেনি। নিউ ফ্রান্সের উদীয়মান সূর্য সেখানেই অস্ত গেল--- তারিখটা বোধ হয় ছিল ২৩শে সেপ্টেম্বর। সে দিনটার কথা ইংলিশ ক্যানাডা হয়ত মনে রাখবার কোনও তাগিদ বোধ করবে না, কিন্তু ফরাসীভাষীরা ভুলবে কেমন করে। এ ইতিহাসের একটা ভাসা ভাসা জ্ঞান আমার ছিল বলে আমার মনেও তখন যেন সেই যুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ বারবার ধ্বনিত হতে থাকলো---আমি যেন দেখলাম সেই ময়দান যেখানে এখন টুরিস্টদের প্রমোদোদ্যান তৈরি করা হয়েছে, অথচ এখানেই এক জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়ে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে আরেক জাতি। আরো দেখলাম সেই পুরনো প্রবাদের প্রামানিক চিত্রঃ পৃথিবীর ইতিহাস কখনোই বিজিত জাতিরা লেখেনা, লেখে বিজেতারা। বিজিতরা কেবল লেখে তাদের অশ্রুগাথা।
জানি, এটা ১৭৫৯ নয়, ২০১১। জুলাই মাসের রৌদ্রঝলমল এক আনন্দমুখর অলস দুপুর। আমরা ক’টি সুখের পায়রা সখের ক্যামেরা হাতে আরো আনন্দ কুড়োনোর কল্পনা নিয়ে বেরিয়েছি পথে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এযুগের প্রায় প্রতিটি মানুষকে একেকটি ফটোসাংবাদিক বানিয়ে দিয়েছে। চারদিকে শুনছি ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ। এ যেন নতুন যুগের নতুন পাখিদের এক অভিনব কলরব। আমার সঙ্গী তিনটিতে যে কত অসংখ্য ছবি তুলে ফেলল সেখানে তার সীমা হয়ত তারাও জানেনা। প্রযুক্তি কি আশ্চর্য ক্ষমতা তুলে দিয়েছে সাধারণ মানুষের হাতে। প্রতিটি মানুষই এখন প্রায় পুরো একটা সময়েরই সাক্ষ্য বহন করার ক্ষমতা অর্জন করেছে এমন একটি ক্ষুদ্র যন্ত্রের মাঝে যাকে ঘাড়ে করে বইতে হয়না, বুকপকেটেই ভরে রাখা যায় অনায়াসে। ইতিহাস জানার জন্যে এখন আর লাইব্রেরিতে যেতে হয়না দুর্লভ গ্রন্থ খোঁজার জন্যে, পকেট থেকে যন্ত্রখানা বের করে নিলেই হয়।
লাঞ্চের পর শ্যামপ্লেইন চত্ত্বরে দু’টি মেয়ে তাদের খেলার বেসাতি নিয়ে হাজির হল। ওদের চেহারা অবিকল এক, নিশ্চয়ই মায়ের পেটের বোন তারা। হয়তবা যমজও। অল্পক্ষণের মধ্যেই ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেল মেয়েগুলির ভোজবাজি দেখার জন্যে। দর্শকদের বসার জায়গা স্টেডিয়ামের মত করে তাকে তাকে সাজানো কাঠের টুল। আমি, মুকুল আর মুনির আরাম করে বসে পড়লাম সেখানে। ফেরদৌস পাশে দাঁড়িয়ে তার ক্যামেরাটিকে নির্দয়ভাবে পরিশ্রম করাতে ব্যস্ত রইল। ভরা দুপুরের খাড়া রৌদ্রে গা পুড়ে যাচ্ছিল, ঘাম ছুটছিল কপাল বেয়ে, আমাদের, খেলা দেখানো মেয়েদুটিরও। আমরা রুমাল দিয়ে, কাগজ দিয়ে মুখ ঢেকে রোদের তাপ আড়াল করবার চেষ্টা করছিলাম। জীবিকার তাড়নায় খেলা চলতে থাকা মেয়েগুলোর অবশ্য সে উপায় ছিল না। ওদের মুখের হাসিটা যেন স্থায়ীভাবে এঁটে দিয়েছে নিয়তি তাদের মুখের ওপর---ওটা তাদের অংগভূষণ। হাজাররকম খেলা দেখালো তারা---ছোট বল, বড় বল, ছোট লাঠি, বড় লাঠি, বেলুন, বিশাল বেলুন, কতরকমের ভোজবাজি আর যাদুমন্তর। বাচ্চাগুলি কুলকুল করে হাসছিল আর হাততালি দিচ্ছিল প্রাণ ঢেলে। তাদের বাবামায়েরাও। যত হাততালি ততই লোকের ভিড় বাড়ে, ততই মেয়েগুলোর উত্‌সাহ বাড়ে। তাদের হাসিটা আরো প্রশস্ত হয়। ওদের সেই হাসি দেখে ছোট একটা কষ্টের সুর বেজে উঠল আমার মনে। ওদের এই হাসি তো চাঁদের হাসি নয়, এ-হাসি বুকভরা জলের তিরতির করে বয়ে যাওয়া স্রোতের শব্দ---এহাসি মেকি চামড়ার হাসি। ভগ্নস্বপ্নের হাসি। আমি জানি সংসারে কোনও ছেলেমেয়েই সার্কাসের খোলা মাঠে সং দেখানোর উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে শিল্পকলা স্কুলে ভর্তি হয় না। তারা সেখানে যায় বিশাল স্বপ্ন নিয়ে----বড় বড় কনসার্ট হলে হাজার দুহাজার দর্শকের মুহুর্মুহু করতালির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান করার কল্পনাতে। কিন্তু হায়, কনসার্ট হলের দরজাটি যে বড়ই ছোট----হাজার স্বাপ্নিকের মধ্যে বড়জোর একজনের ভাগ্যে হয়ত জোটে তার প্রবেশাধিকার। এ বড় নিষ্ঠুর পৃথিবী বিনোদনশিল্পীদের।
দর্শকদের হাততালিতে উত্‌সাহিত হয়ে তারা দর্শকদের মাঝ থেকে বাচ্চাবুড়ো যার প্রতি চোখ যায় তাকেই বাছাই করে তাদের খেলায় নামিয়ে আনতে লাগল। একসময় কি হল, হয়ত আমার সুডোল টাকখানার নিখুঁত ঝলকে আকৃষ্ট হয়ে, একটি মেয়ে আমার কাছে এসে দুষ্টুমি করে খুব আলতো করে টাকখানা তার তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রাখল এক পলক। আরেকটি মজার খেলা দর্শকদের জন্যে। বিশ বছর আগে হলে আমার চোখমুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠত, কিন্তু সেদিন আমিও হাসলাম আমার প্রাণখোলা হাসি, আর মেয়েটির চোখের তারাতে দেখলাম সেই ছদ্মবেশি দীর্ঘশ্বাস, যা তার ত্বকের সঙ্গে এঁটে রয়েছে এক করুণ ছায়ার মত।

মন্ট্রিয়ল ফিরে এলাম সন্ধ্যা আটটায়। দিনটা ছিল শুক্রবার। এই দফাতে রাজা-মনিকার বাড়িতে নয়, আকলিমার বাসায়---মন্ট্রিয়ল শহরের একেবারে পূর্ব প্রান্তে যেখানে হাইওয়ে ৪০ তিনভাগে ভাগ হয়ে একভাগ চলে গেছে কিউবেক শহরের দিকে। আকলিমাকে চেনেনা এমন বাংলাদেশি মন্ট্রিয়লে হয়ত নেই---ওর মত স্বাধীনচেতা, সাহসী বাঙালি মেয়ে খুব দেখিনি আমি। ও আমার বড় প্রিয়, বড় আদরের মেয়ে। ওর কথা লিখতে গেলে বড় উপন্যাস হয়ে যাবে। আজ থাক। শুধু বলব, ও রাত ১১টা থেকে ভোর ৭টা পর্যন্ত নাইট শিফ্‌টে কাজ করে। তদুপরি সপ্তাহে তিনদিন অন্য এক দোকানে কেশিয়ারের কাজ করে বিকেলবেলা। সপ্তাহে দুদিন সে ঘুমায়, তিনদিন চাকরি করে। কেন করে সে কাহিনী এখানে বলার জায়গা নয়। তবু ওর মনের দরজাটিতে কখনোই খিড়কি লাগানো হয়না। যতবার মন্ট্রিয়লে যাই ততবারই ওর বাড়িতে থাকতে হয় আমাকে। অন্য কেউ সঙ্গে থাকলেও। ওর এক কথাঃ আমার বাড়িতে থাকার জায়গার অভাব হতে পারে, তাই বলে আমার মনের জায়গার অভাব থাকবে কেন? মানুষ আমার ঘর আর বিছানায় থাকে না, থাকে আমার প্রাণের শয্যাতে। আকলিমার মনরক্ষার জন্যেই আমরা চারটিতে মিলে ওর দরজায় গিয়ে হাজির হলাম। বিস্তারিত রান্নাবান্না করে রেখেছিল সকালবেলা কাজ থেকে ফেরার পর। আমরা মুখহাত ধুয়ে খেতে বসলাম। আহারশেষে কিছুক্ষণ আমাদের সাথে গল্পগুজব করে সে আবার বেরিয়ে গেল রাতের শিফটের জন্যে। চোখেমুখে বিন্দুমাত্র ক্লান্তির লক্ষণ নেই। এ এক অদ্ভুত মেয়ে।
সকালবেলা আকলিমা বাসায় ফেরার আগেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম সফরের শেষ পর্বটিতে। এবারের গন্তব্য শ’খানেক কিলোমিটার দূরবর্তি মন্ট ট্রম্বলে নামক এক পার্বত্য অঞ্চল, যার গ্রীষ্মকালীন প্রমোদাগার বলে যতনা খ্যাতি তার চেয়ে বেশি খ্যাতি শীতঋতুর জনপ্রিয় স্কি-নিবাস হিসেবে। আমরা গরমের দেশের মানুষ, আমাদের শীত কাটে কম্বল আর কাঁথার নিচে, বরফের পাহাড়ে স্কিতে চেপে পাগলের মত ঢালুর দিকে ছোটা নয়। আমাদের জন্যে গ্রীষ্মের মন্ট ট্রম্বলেই বরং বেশি সুন্দর।
ঘন্টাদেড়েকের মাঝেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। পথে যেতে যেতে চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে দেখেই প্রাণ ভরে গেল। ভারি সুন্দর এই জায়গাটি। এদেশে এতবছর ধরে বাস করছি আমি, অথচ নিজের উঠান থেকে সামান্য বেরুলেই যে চোখের সামনে ভূস্বর্গ চলে আসে হ্যালো বলার জন্যে, কল্পনাই করিনি। টুরিস্ট তথ্য অফিসে গিয়ে কোথায় কি আছে যা না দেখলেই নয়, তার একটা ধারণা পাওয়া গেল। ম্যাপ দেখে দেখে একটা জমজমাট জায়গায় গিয়ে আমরা গাড়ি পার্ক করলাম পার্কিং লটে। সে এক এলাহী কাণ্ড। যেন পাহাড় কেটে তারা এক স্বর্গোদ্যান রচনা করেছে শিল্লকলা আর বানিজ্যবুদ্ধিকে একসাথে করে। যেন পাহাড়ের গায়ে গেঁথে রেখেছে এক প্রকাণ্ড মুরাল কোনও স্বাপ্নিক চিত্রকর।
শীতের স্কিবিলাসীদের সখের পাহাড় হলেও গ্রীষ্মে সেপাহাড়কে তারা ব্যবহার করেছে টুরিস্টদের কেবলকারযোগে এক চূড়া থেকে আরেক চূড়াতে আকাশপথে ভ্রমন করার সুবিধার্থে। যেন গিরিশৃঙ্গের এক উদ্যান হতে আরেক উদ্যানে উড়ে উড়ে ঘোরার মত, ডানাযুক্ত পক্ষীরা যেমন করে ঘোরে। আজ থেকে কত অযুতবর্ষ আগে কবেকার কোন্‌ নীল পর্বতের শৃঙ্গদেশে আরোহন করেছিলাম যৌবনের কোন অজানা দ্বীপের পারে মনে নেই। তাই মন্ট ট্রম্বলের সেই কেবলভ্রমন এক নতুন শিহরণ আমার জন্যে। এদিক ওদিক যেদিকে তাকাই সেদিকেই আনন্দের জোয়ার বইছে অবিরাম ধারায়। এখানে অনাবিল সুখের অনন্ত ফোয়ারা। দ্বিধাসংশয়হীন ভ্রমনবিলাসী পথিক এখানে সংসারের সব জ্বালা যন্ত্রনা আড়াল করে, সময়ের রূঢ় শাসনকে অমান্য করে, এক প্রসন্ন বিকেলের অলীক জগতের বাসিন্দা হতে পেরেছে। মানুষ তার মেধা দিয়ে, কল্পনার যাদুকরি স্পর্শ দিয়ে, তৈরি করেছে এক অবিশ্বাসের ক্ষণদ্যুতি, যার আলেয়ার মত চোখ তার স্মৃতির এলবামে জমা থাকবে চিরকাল। এ এক অদ্ভুত জগত, কাচের আর্শিতে দেখা অবাস্তব, প্লাস্টিকের জগত। ওরা তিনটিতে একঝুড়ি ছবি তুলল সেখানে---স্বভাবতই। নিজেদের ছবি, নিজেদের বিকল্প বাস্তবতাতে প্রবেশ করবার ছবি, অন্য মানুষদের অবিশ্বাস্য সুখের ছবি পাহাড়ের গায়ে গায়ে লাগানো। সারা বিকেল ওই পরাবাস্তবের পরশলব্ধ ঘরের মধ্যে কাটিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম ঢালু পথের বাস্তবতায়---আমাদের শেষ গন্তব্য মন্ট্রিয়ল, রাজা-মনিকার গীতিময় কুঞ্জবনে।


কথা ছিল সকালবেলা আমরা অটোয়াতে ফিরে যাব। হঠাত্‌ করে মনিকা বলে উঠলঃ আমরাও যাব। এই স্বতস্ফূর্ততাটি, এই যে বনের হরিণশাবকের মত এই আছি এই নেই’র অপরিকল্পিত খেলা, ওটাই মনিকার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। বলা নেই কওয়া নেই, চল যাই মীজানভাইয়ের বাসায়। রাজা তার স্ত্রীকে ভাল করেই জানে। তার বউটি যে এমনি করে পাখিদের মত এক ডাল থেকে আরেক ডালে যখন তখন উড়ে যাবার ক্ষমতা রাখে সে খবর তার জানা। স্ত্রীর কথায় সায় দেওয়া ছাড়া উপায়ই বা কি। পৃথিবীর সব স্বামীরা কি তাদের স্ত্রীদের ডানাযুক্ত মনের খবর রাখে? বোধ হয় না।
আমি নিজেও যে এরকম মুহুর্তের উল্লাসে মুহুর্তের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া পছন্দ করিনা তা নয়। যৌবনে আমি বরাবরই তা করতাম----কোন সঙ্গী না পেলে একাই করতাম। বিয়ের পর আমার স্ত্রীকে কতবার জ্বালাতন করেছি এই স্বভাব নিয়ে। কিন্তু মন্ট্রিয়লে মনিকার মুখ থেকে অটোয়া যাবার বাসনা প্রকাশ পাবার পর মনে মনে ভাবলাম---এ তো আনন্দের কথা, কিন্তু খেতে দেব কি এদের সবাইকে। রান্নাবান্না তো বেশিকিছু করা হয়নি। ভাগ্যিস পোলাওটা ডিপ ফ্রিজে রেখে এসেছিলাম। কাবাব-পারোটা আর মুরগির মাংস যা আছে তাতেই চলে যাবে। আমি তো বরাবরই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রান্না করি যাতে রোজ রোজ রান্নার ঝামেলাতে যেতে না হয়। যাই হোক, অটোয়াতে এসে আমি কাপড়-চোপড় ছাড়ার আগেই ভাত আর ডাল বসিয়ে দিলাম স্টোভে। ও হ্যাঁ, গত সপ্তাহে গরুর মাংস সবটা খাওয়া হয়নি, ওটাও কাজে লাগবে।
গোসল-টোসল সেরে ওরা ধরল অটোয়া দেখবে। বল কি? সূর্য ডোবে ডোবে প্রায়, কাল সকালে তোমরা যে-যার বাড়ি ফিরে যেতে চাও, এতটুকু সময়ের ভেতর অটোয়ার কতটুকুই বা দেখাতে পারব তোমাদের?
যতটুকু সম্ভব, ততটুকুতেই তুষ্ট আমরা। তথাস্তু বলে আমি ওদের নিয়ে রওয়ানা হলাম কর্নেল-বাই-ড্রাইভ ধরে সাসেক্স ড্রাইভের রিডো প্রপাত দেখাব বলে।


সাত

দূরের যাত্রীরা অটোয়াতে এসে প্রথমেই দেখতে চায় পার্লামেন্ট বিল্ডিং। যেন অটোয়ার সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গা সেখানেই। যেন এর বাইরে বিশেষ কিছু দেখবারও নেই শহরটিতে। ইউরোপ-আমেরিকার কোন কোন মন্তব্যকার এমনও উক্তি করেছেন যে অটোয়া একটি ‘মরা’ শহর---সন্ধ্যার পর এখানে হোটেলে গিয়ে লম্বা ঘুম দেওয়া ছাড়া আর কিছু করবার থাকে না। অবশ্য ‘মরা’ শহর বলতে সম্ভবত তাঁরা বুঝাচ্ছেন এখানে রাত বারোটার পর স্ট্রিপ ক্লাবে গিয়ে রূপসী বালাদের মুক্তবক্ষ ও স্বল্পভূষণ নৃত্যলীলার সুরাসিক্ত মদিরাতে মগ্ন হয়ে থাকার অবারিত অবকাশ তেমন নেই, তাহলে আমি সানন্দে গ্রহণ করে নেব সেই ‘অপবাদ’। ‘সানন্দে’ বলার কারণ অটোয়াতে ওসবের সুযোগ ততটা নেই বলেই। এখানে ছেলেমেয়ে নিয়ে দুপুর-বিকেল-রাত বিরাত যে কোনও সময় যে-কোন রাস্তায় নিশ্চিন্তে নিরাপদে ঘুরে বেড়ানো যায়---যা হয়ত টরন্টো-মন্ট্রিয়ল আর নিউ ইয়র্ক-লণ্ডন-প্যারিসের মত সদাজাগ্রত ‘জীবিত’ শহরে সম্ভব হয়না। বাইরে থেকে অনেকে ভাবেন অটোয়াতে কেন্দ্রীয় সরকারের কতগুলো দালানকোঠা আর অফিস-আদালত ছাড়া আর কিই বা আছে উল্লেখ করার মত। আছে, অনেক কিছুই আছে, যা দেখতে হলে চোখ লাগে।
এ-শহরে আমি একনাগাড়ে বাস করছি ছিয়াল্লিশ বছর হয়ে গেল। এখানে আমার ছেলেরা জন্মেছে, আমার কর্মজীবনের সিংহভাগই অতিবাহিত হয়েছে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে, এখানেই আমার স্ত্রীর কবর। এ-শহর আমার জন্মস্থান নয়, এর সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ নেই, কিন্তু এর সঙ্গে আমার প্রাণের যোগ আছে, এর সঙ্গে আমার ব্যক্তিসত্তা ও বোধবুদ্ধির ক্রমবিকাশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত ৪৬ বছরে পৃথিবীর বহু দেশ, বহু নগর-বন্দর ভ্রমন করার সুযোগ হয়েছে আমার কর্মোপলক্ষে, কিন্তু আমার মন বারবার ফিরে এসেছে এই ‘মরা’ শহরেরই দ্বারপ্রান্তে। এ শহর যদি মরে গিয়ে থাকে বাইরের নিত্যপ্রমোদকামী সখের পর্যটকের চোখে, আমার চোখে সে জীবনসুধার অনন্ত ভাণ্ডার।
আমার বাসা থেকে রোজ সকালে আমি গাড়ি নিয়ে হগ্‌স্‌ ব্যাক ব্রিজ পার হয়ে বাঁদিকে মোড় নিই কর্নেল-বাই ড্রাইভের ওপর। সেখানেই ছবির মত দেখতে এই সর্বজনপ্রিয় রাস্তাটির দক্ষিণ সীমা। দুদিকেই যেন শান্তি ও সুন্দরের অবারিত মিলনভূমি। প্রকৃতি আর মানুষের মিলনবন্ধন সেখানে নানা বর্ণে নানা সজ্জায় প্রকাশ পেয়েছে। ডানপাশে মুখ ফেরালে দেখা যায় রিডো নদী দশবারো মিটার উঁচু থেকে প্রপাতের ধারাতে গড়িয়ে পড়ছে নিচের প্রস্তরবিজড়িত অতল গহ্বরে। এর অপরপাশে প্রকাণ্ড পার্ক---এক প্রাক্তন গভর্নর জেনারেলের নামানুসারে যার নামকরণ হয়েছে ভিন্সেন্ট মেসি পার্ক। গ্রীষ্মকালে এখানে ছেলেরা ঘুড়ি ওড়ায়, সখের সঙ্গীতপ্রেমিকরা তাদের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসে যায় খোলা মাঠের টিকেটবিহীন কনসার্ট দিতে। আমার বাঁপাশে গাছগাছাড়ির ছায়ায় ছায়ায় চুপি চুপি বয়ে চলেছে রিডো ক্যানাল---এটা প্রকৃতি নিজের উদ্যোগে তৈরি করেনি, মানুষই তার নির্মাতা। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন সমরকৌশল হিসেবে এটা তৈরি করেন কর্ণেল বাই নামক এক মেধাবী প্রকৌশলী। উদ্দেশ্যঃ সৈন্যসামন্ত পারাপার করা সুগম্য জলপথে। পুরো চার বছর লেগেছিল খালটি খনন করতে রিডো নদীর একমাথা থেকে উত্তরের অটোয়া নদী পর্যন্ত। দুই নদীর উচ্চতা অসম হবার কারণে জায়গায় জায়গায় বেশ কটি লক দাঁড় করাতে হয়েছিল----অনেকটা পানামা খালের ছোট সংস্করণের মত। খালটির চিকন শরীর মাঝখানে এসে বড় হ্রদের আকার নেয়---যার নাম ডাউজ লেক। অটোয়াতে যারা স্থায়ীভাবে বাস করেছেন বেশ কয়েক বছর তাদের অতি প্রিয় এই হ্রদটি। তাদের মন বারবার এ হ্রদের কাছে ফিরে আসে। নগরের ক্যাপিটেল কমিশন অতি যত্নের সঙ্গে সারাবছর, এমনকি গভীর শীতে হ্রদের জল হিমের পাথরে পরিণত হবার পরও, সাজিয়ে রাখে চারধারের পরিপার্শ্ব। দক্ষিণে বিশাল এলাকা জুড়ে নানাজাতের বৃক্ষলতার নরম আচ্ছাদনে আবৃত অরণ্যোদ্যান----কেন্দ্রীয় সরকারই এর রক্ষণাবেক্ষ্ণণের মালিক। ৩০/৩৫ বছর আগে আমার ছেলেদের নিয়ে এখানে গাড়ি পার্ক করে বর্শি-ছিপ নিয়ে মাছ মারতে যেতাম ডাউজ লেকের ধারে। মত্‌সপ্রেমিক বন্ধুবান্ধব যারা ছিলেন তখন অটোয়াতে তাঁরাও আসতেন প্রায় প্রতি উইকেণ্ডেই। এখন তারা কেউ নেই। এখন সেখানে কেউ মাছ ধরতে যায় না। সময় বদলে গেছে, মানুষ বদলে গেছে। তবু আমি এখনো মাঝে মাঝে চলে যাই সেখানে, একা একা, গরমের দিনে। ডাউজ হ্রদের বিষণ্ণ নীল জলেতে স্মৃতির প্রতিবিম্ব দেখি। নিজের মুখটির সাথেও আলাপপরিচয় হয় নতুন করে। এ হ্রদ আমাকে সবসময়ই স্থান থেকে স্থানান্তরে নিয়ে যায়।
রিডো খাল যেখানে মিশেছে তার প্রেমিকের সাথে, তার ঠিক পাশেই নগরের আন্তর্জাতিক আকর্ষণ---পার্লামেন্ট বিল্ডিং, যা না দেখলেই নয় বাইরের পথচারীদের। তার ঠিক উলটো দিকে কলকাকলি মুখরিত বাইওয়ার্ড মার্কেট----শুনেছি সেখানেই যা কিছু প্রমোদ মধ্যরাতের নৈশজীবনপ্রেমিকদের। আধুনিক নগরের যা কিছু ঝলক চমক লীলা ছন্দ নিশীথের আধো আলো আধো আঁধারের আবছা আলেয়াতে তার বেশির ভাগই বাইওয়ার্ড মার্কেটের অলি্তে গলিতে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সুযোগ হয়নি কখনো রাতের বেলা সেখানে গিয়ে অটোয়ার নৈশজীবনের স্বাদ গ্রহণ করা। আমি যাই কালেভদ্রে, মাছের দোকান থেকে টাটকা মাছ কেনার জন্যে। টাটকা মাছের সঙ্গে মুক্তবক্ষ টাটকা রমনীদের খুব একটা সংশ্রব থাকার কথা নয়।
অনেকের হয়ত জানা নেই যে একসময় শহরটির নাম ছিল বাইটাউন। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে শহরটির বিপুল সম্প্রসারণ ঘটে কাষ্ঠসম্পদপুষ্ট ব্যবসাবানিজ্যের তুমুল প্রসারের কারণে। অটোয়া নদীর এপার-ওপার দুপারই বেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন এর নাম বদলে অটোয়া হয়ে যায়, যার উত্‌পত্তি উটাউই নামক এক স্থানীয় ইণ্ডিয়ান গোত্র। এই নামকরণটি ঘটে ১৮৫৫ সালে। সেসময় ক্যানাডার অস্থায়ী রাজধানী ছিল কিংস্টন। স্থায়ী রাজধানীর দাবি জানিয়েছিল চারটি শহরঃ কিংস্টন, টরন্টো, অটোয়া ও মন্ট্রিয়ল। ব্রিটেনের তত্‌কালীন রানী ভিক্টোরিয়া অটোয়ার সমর্থনে রায় দিলেন, ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে। তখন থেকেই আমাদের এই প্রিয় শহরটি সারা ক্যানাডার রাজধানী।
রিডো খাল যেমন শেষ হয়ে যায় পার্লামেন্ট বিল্ডিঙ্গের সামনে, কর্নেল-বাই ড্রাইভও তেমনি আত্মসত্তা হারিয়ে ফেলে ঠিক তারই কাছে, যেখানে তার নাম হয়ে যায় সাসেক্স ড্রাইভ, রিডো স্ট্রীট পার হবার পরই। অটোয়ার মানচিত্রে এ-রাস্তাটির বিশেষ স্থান। এমন কোনও বড় রাস্তা নয়, কিন্তু জাতগরিমায় বড়। যুক্তরাষ্ট্র আর সৌদি আরবের দূতাবাস এর ওপর। ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি, মেজর্স হিল পার্ক যেখানে বিবিধ উত্‌সব-অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় প্রতি গ্রীষ্মে, যেখানে অটোয়ার বৃহত্তম বইয়ের দোকান চাপ্টার্স, যেখানে ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসস্থান, অটোয়ার সিটি হল যেখানে নগরপতিদের কর্মালয়, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়, জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদের গ্রন্থাগার। একজায়গায় গিয়ে রাস্তাটি খানিক ডানদিকে বেঁকে যায়, যেখানে অটোয়া নদী চোখ মেলে তাকাবে আপনার দিকে। অদূরে, হাতের বাঁদিকে নদীর ধারে আমার অতিপ্রিয় একটি জায়গা---রিডো ফল্‌স্‌। সূর্য ডোবার ঠিক আগে আগে এ-জায়গাটি এক অপূর্ব রূপ ধারণ করে। ভাবলাম, অল্প সময়ে বেশি কিছু তো দেখবার সুযোগ হবে না, অন্ততঃ ভিন্নরকম একটা সূর্যাস্ত দেখুক ওরা। রিডো নদী এখানে এসে প্রপাত হয়ে অটোয়া নদীতে মিশেছে। হগ্‌স্‌ ব্যাক প্রপাত থেকে একটু স্বতন্ত্র, কারণ এর উঁচু স্তর থেকে নিচুতে যে পতন সেটি অপরিকল্পিত বা অনিয়ন্ত্রিত নয়----মানুষ তার কল্পনার রঙ মিশিয়ে এমন করে সাজিয়েছে তাকে যে পাশের রেলিং ধরে নিচে তাকালে মনে হবে পুরনোদিনের নববিবাহিত দম্পতির বাসরঘরের বাসরশয্যাটি যেমন করে সাজানো হত বেলিফুলের ঝালর দিয়ে ঠিক তেমন। ‘রিডো’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থঃ আবরণ, যার সঙ্গে পুষ্পাবরণের উপমাটি মোটামুটি মিলে যায় বলেই মনে হয় আমার। অসম্ভব নিশ্চুপ, নিরিবিলি একটি জায়গা--যেন প্রপাতের ঝর্ণাধারার মৃদু কলরব কান পেতে শোনার জন্যে সমস্ত অন্তরীক্ষই সেখানে নেমে এসেছে চুপিচুপি। প্রকৃতি সেখানে তার নীলাম্বরি সজ্জাতে গীতিময় হয়ে আছে। সন্ধ্যার আকাশে তখন গোধূলির ম্লানমুখ। নদীর ওপারে কিউবেকের গাছপালা বনবনানীর ফাঁকে ফাঁকে আধুনিক জগতের যন্ত্রদানব যেন মাথা তুলে হ্যালো বলতে চাইছে আমাদের। অস্তগামী সূর্য তার শেষ কিরণটুকু ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে দিগন্তের পারে। সে এক অলৌকিক মুহূর্ত। যেকোন বিদায়ের মুহূর্তেই একপ্রকার অলৌকিকতা থাকে বলে আমি বিশ্বাস করি---তার মাঝে সবচেয়ে বেশি অলৌকিকতা সৃষ্টি করে এই জলাশয়ের সূর্যাস্ত, অন্তত আমার বিচারে।
হয়ত একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম আমি। এপাশওপাশ তাকিয়ে দেখি ওদেরও প্রায় একই অবস্থা। অন্যমনস্ক হয়নি কেবল মনিকা-রাজার ছোটমনি ঋত্বিকা। আনমনা হবার বয়স ওর নয়, উচ্ছ্বসিত আর উত্তেজিত হবার বয়স। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে লক্ষ করলাম আঁধারে-আলোতে আচ্ছন্ন এক মোহিনী আকাশের গায়ে কে যেন কোন্‌ ভাস্কর জ্যামিতির ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আর পঞ্চভুজের মত করে কি এক আশ্চর্য সৌধ রচনা করেছেন। ওটা কি বাস্তব কিছু? নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিশ্চয়ই আগেও দেখেছি অনেকবার, কিন্তু সাঁঝের আবছা আলোতে এ যে আকাশ স্পর্শ করে সে-বোধটি এই প্রথম এল মনে। আশ্চর্য, পৃথিবীতে কত জিনিস আছে যা হাজারবার দেখেও আমাদের চোখে পড়ে না, তারপর হঠাত্‌ করে সেই একই জিনিস কোন এক অলীক মুহূর্তে এমন রূপে দেখা দেয় যে মনে হয় জিজ্ঞেস করিঃ এতদিন কোথায় ছিলে তুমি।
পরের দিন সকালবেলা রাজা-মনিকারা চলে গেল মন্ট্রিয়লের পথে। ঘন্টাদুয়েক পর বিদায় নেবার পালা ফেরদৌস-মুনির আর মুকুলের। বাড়িতে ফিরে এল আমার অতিপরিচিত বন্ধু--নির্জনতা। এক পথের শেষ, আরেক পথের নীরব যাত্রা। এই তো জীবন।

অটোয়া,
১৫ই সেপ্টেম্বর, ‘১১
মুক্তিসন ৪০

মীজান রহমান: বিশিষ্ট গণিতবিদ।
প্রফেসর এমেরিটাস, কার্লটন ইউনিভার্সিটি-অটোয়া (১৯৬৫-১৯৯৮)
প্রভাষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়(১৯৫৮-৬২)
পিএইচডি- ইউনিভার্সিটি অব নিউ ব্রান্সউইক-কানাডা-১৯৬৫
ভারত গণিত পরিষদের আজীবন সদস্য।
গণিত বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ ও বাংলা ভাষায় বিভিন্ন রচনাভিত্তিক অসংখ্য গ্রন্থের প্রণেতা।