আশায় আছি আশার আলো দেখবো বলে ।। আলী রীয়াজ
এইদেশ সংগ্রহ , সোমবার, অক্টোবর ০৮, ২০১২


"আশার কোনো আলোই তো আর দেখতে পাচ্ছি না। যেখানে আমাদের আশা, সেই তরুণেরা কোথায়? এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক হানাহানির ইতিহাস পুরোনো, খুবই করুণ, খুবই ভয়াবহ, খুবই লজ্জাজনক, কিন্তু সেই সঙ্গে আছে শুভবাদী মানুষের প্রতিরোধের চেষ্টা, আছে শান্তির সপক্ষের মানুষদের সমাবেশ। আশির দশকেও আমরা দেখেছি, বন্যায় কিংবা সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তারুণ্যের মহা-উদ্যোগ। আজ সেই শুভবাদী তরুণেরা কোথায়?" আনিসুল হক প্রথম আলোতে যে প্রশ্নটা করেছেন তা কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, অত্যন্ত জরুরি। ফেইসবুক, সংবাদপত্র এবং অন্যান্য মাধ্যমের সূত্রে বাংলাদেশের তরুণদের চিন্তাভাবনা যতটুকু বুঝতে পারি তাতে এই প্রশ্নটা আমার মনে গত কিছুদিন যাবতই ছিল। প্রশ্নটা তুলতে দ্বিধা হচ্ছিলো কেননা দেশের থেকে দূরে থাকি। আনিসুল হকের এই লেখাটা আমার সময় সোমবার সন্ধ্যায় যখন পড়ি তার আগে দিনের বেলা এক বন্ধুর স্ট্যাটাসে দেখেছি হতাশার কথা - সে আর বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না এবং তাঁর প্রশ্ন এই সমস্যাটি কি শুধুই তার একার নাকি অন্যদেরও। দিন কয়েক আগে আমার এক বন্ধু, যাকে আমি চিনি ৩৬ বছর ধরে এবং কখনোই নিরাশ হতে দেখিনি, অসহায় হতে দেখিনি সেই বন্ধুটি লিখেছে, “রীয়াজ, স্বীকার করি আজ প্রচণ্ড অসহায় বোধ করি। ... এখন বয়স হয়েছে বলে এই অসহায়ত্ব? নাকি দেশ এখন এতই অচেনা আর আমি নিঃসংগ, তাই?” আজ সকালে আমার আরেক বন্ধু আমার সাম্প্রতিক স্ট্যাটাসের পরিপ্রেক্ষিতে বার্তা পাঠিয়েছেন, আপনি ঠিকই লেখেন, বলেন কিন্ত দেশে এখন কেউ এসব নিয়ে ভাবতে সময় দিতে রাজী না, তার নিজ নিজ স্বার্থের বাইরে বিবেচনা করেনা।

সকলেই একই কথাই বলছেন - তাঁরা আশা দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁরা কেউই চান না হতাশ হতে। তাঁরা জানেন অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্ত আরো অনেক অর্জন সম্ভব হয়নি। তারচেয়েও বড় বিষয় হল আগামীতে যে আমরা অর্জন করতে পারবো তার জন্য যে বড় শক্তি – তারুণ্য তাঁরা কি স্বপ্ন দেখাচ্ছেন? যারা আশা দেখাবেন, সে তরুণদের মধ্যে সেই আশার আলো তাঁরা দেখতে পান না বলেই চারিদিকে এই হতাশার সুর। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আসলে তারুন্যের ফসল, তার অর্জনের অনেকটাই তারুণ্যের শক্তিতে ভর করে এসেছে। কিন্ত মাঝে মাঝে মনে হয় এখন বড় কোনো আদর্শ নয়, বড় কোনো স্বপ্ন নয় – বাংলাদেশের তরুণদের এক বড় অংশ-ই আশু, সাময়িক, পার্থিব অর্জনকেই চূড়ান্ত লক্ষ বলে গন্য করছে। অন্যদিকে আছে বিরোধিতার কারণে বিরোধিতার এক ধরণের মানসিকতা। আছে দলীয় বিবেচনার টুপিতে চোখ-কান ঢেকে ফেলার মানসিকতা। আমার বন্ধুকে যে কথা লিখেছিলাম আবার তাই বলি, “এই অসহায়ত্ব বয়সের নয়, নিঃসঙ্গতার নয় – আমরা অনেক দুঃসময় দেখেছি। কিন্ত আজ তোর, আমার, আমাদের এই অসহায়ত্ব হল আশাহীনতার অসহায়ত্ব। আশা করবার জায়গাগুলো এখন ক্রমাগতভাবে ভেঙ্গে পড়েছে, যে সংকীর্ণতা ও কূপমন্ডুকতার বিস্তার ঘটেছে তাই আমাদেরকে অসহায় করে ফেলছে। আমাদের চারপাশে অন্ধকার – তার চেয়েও বেশি হল অন্ধত্ব। আলো জ্বাললে অন্ধকার দূর হয়, কিন্ত এই অন্ধত্ব দূর হবে কি ভাবে? যত আলোই জ্বালানো হোক না কেন, দৃষ্টিহীনের অন্ধকার তো দূর হবে না যতক্ষন না প্রাণের ভেতরের আলো পথ দেখাচ্ছে। প্রাণের ভেতরের আলো বাইরের মানুষ জ্বালায় না – জ্বলে ওঠে নিজের উপলব্ধি দিয়ে”।

আনিসুল হক তরুণদের মধ্যে শুভবাদীদের দেখতে পান নি বলেই তার মনে এই প্রশ্নঃ “আজ সেই শুভবাদী তরুণেরা কোথায়?" তরুণদের মধ্য শুভবাদী চিন্তার উপস্থিতি নেই কেননা শুভ-অশুভের বিচার থেকে সম্ভবত তরুণদের এক বড় অংশ অনেক দূরে। কেননা আমাদের চারপাশে অনুকরনীয় আদর্শস্থানীয় মানুষ নেই – যারা আছেন তাঁদের আমরা অপমানিত করছি প্রতিদিন; তাঁদের সীমাবদ্ধতাকেই দেখছি - তাঁদের সাফল্যকে নয়, অবদানকে নয়। আমরা বড় হতে চাই অন্যকে ছোট করে, অন্যের সম্মানহানি করে কে কবে নিজে সম্মানিত হয়েছেন এই প্রশ্ন আমরা করিনা। এই যখন সমাজের চেহারা তখন আমাদের তরুণদের সামনে কি থাকে স্বার্থপর হওয়ার উদাহরণ ছাড়া? স্বার্থপরতা আলো জ্বালায় না, অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। প্রাণের ভেতরে আলো না থাকলে আমরা বাইরে কি করে তা দেখবো? তারপরও সমাজের এইসব সময়েই প্রয়োজন হয় তারুণ্যের সাহস, তারুণ্যের স্বপ্ন। তবে কি আশাহীনতাই কি শেষ কথা? আমি সেটা বিশ্বাস করতে চাইনা, এখনও আমি আশায় আছি আশার আলো দেখবো বলে।

আলী রীয়াজ, শিক্ষক ও লেখক।