সৌন্দর্য্যের এক লীলাভূমি নীলগীরি
হামিদুল আলম সখা , শুক্রবার, অক্টোবর ১২, ২০১২


সুযোগটা এসে গেল । একদিন বান্দরবান এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অবলোকন করার । আমি সাধারণতঃ এসব সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্র নই । উপরওয়ালা আমায় যে চোখ দু’টি দিয়েছেন সে চোখ দিয়ে তারই তৈরী এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের অপরুপ সৃষ্টিকে অবলোকন না করলে জীবনের অনেক কিছুই ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হবে । আমাদের জাগতিক নিয়মাচার সুষ্ঠুভাবে পরিপালন করা অত্যন্ত দুরুহ কাজ । কি সামাজিক , কি ধর্মীয় । অনেক সময় পেরে ওঠা যায় না । বিদেশ বিভূঁয়ের কথা বাদই না হয় দিলাম । শুধু বাংলাদেশের কথা চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, একেক এলাকা একেক আদলে গড়া। তাদের শিক্ষা সংস্কৃতি ,ঐতিহ্য ও কৃষ্টি ভিন্নতর । যেমনভাবে ভাষার পার্থক্য ঠিক তেমনিভাবে তাদের পোশাক আচার অনুষ্ঠানও । চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা,কৃষ্টি ঐতিহ্য আমাকে বরাবরই কাছে টানে । আমি টেকনাফ,কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটিতে তাদের ভিন্ন ভিন্ন কৃষ্টি , ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি অবলোকন করেছি । তবে একটি কথা সত্য মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে চায় । মণিষী আলেকজেন্ডার শেলকার্ক তা প্রমান করেছেন ।
একটি দিন বান্দরবান পাহাড়ী এলাকায় কাটাবো, মনের ভিতর একটা ভাব উদয় হয়ে গেল । এ নিয়ে লেখা-লেখি যে করবো এটা নিশ্চিত । যাত্রার দিন সকাল ৭টায় মাইক্রোতে উঠলাম । আমার সাথে সহকর্মী লতিফভাই ও গাইড উত্তমবাবু । ড্রাইভার এর বাড়ী ফেনী । মধ্য বয়সী । এক নজরে অভিজ্ঞ বলেই মনে হলো । তবুও জিজ্ঞেস করলাম , এ পথে ভ্রমনের অভিজ্ঞতা কেমন ?
-স্যার, প্রায় বিশ বছর এ কাজ করছি । পাহাড়ী অঞ্চলে গাড়ী চালানোই আমার কাজ ।
-তাহলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি । সাবধানে চালাবেন । তাড়াহুড়ার কিছু নেই ।
-ঠিক আছে স্যার ।
উত্তমবাবু জানালো বান্দরবান শহর পেরিয়ে ১৫ কিলোর পর একটি হোটেলে নাস্তা করবো । গাড়ী উপরের দিকে উঠছে । ক্রমে সমতল ভূমির দূরত্ব বেড়ে চলছে । পাহাড়ের গায়ে একটি সুন্দর কটেজ দেখা যাচ্ছে । যা ভেবেছিলাম তাই । এটিই সেই হোটেল । আমরা মাইক্রো থেকে নামলাম । কাঠের তৈরী হোটেল । সিঁড়িটাও কাঠের । আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলাম । বিরাট বড় বারান্দা । দক্ষিণ দিকটায় খোলা । যতটুকু চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড় । উত্তমবাবু ছবি তোলা শুরু করেছেন ।এদিকে পেটের ভিতর খাই খাই করছে । একজন বয় এলো । ওর নাম সো চং । পাহাড়ী । ও যে খবরটা দিল তা শুনে অন্ধকার দেখতে শুরু করলাম । তোর মালিককে ডাক । মালিক এলেন একজন ভদ্রমহিলা । কমলা রং এর জর্জেট শাড়ী পরিহিত । দেখতে সুশ্রী । সুন্দরী দেখে তো কাজ হবে না । খাবার চাই খাবার । উনি বললেন, আমাদের নাস্তার অর্ডার নেবার শেষ সময় ৯.৩০ মিনিট । আমরা দুঃখিত । অনেক অনুনয় করলাম । কাজ হলো না । এটাই তাদের নিয়ম । সুন্দরী দেখে আমদের পেট ভরলো না । ড্রাইভার বললো আমাদের বান্দরবান শহরে যেতে হবে নাস্তা খেতে । তাই হলো । ভদ্র মহিলার বাসা ঢাকার উত্তরায় । স্বামী তাকে হেল্প করে । ১০টি রুম রয়েছে । জায়গাটি লীজ নিয়েছেন । ভালো ইনকাম হয় । সব কিছু বান্দরবান শহর থেকে আনতে হয় ।
আমরা বান্দরবান প্রেসক্লাবের সামনে এসে থামলাম । অন্ততঃ ১০টি হোটেল ঘুরলাম । নাস্তা নেই । আছে সমুচা, সিঙ্গারা ও চা । একটি হোটেলে দুপুরের খাবার তৈরী করছে । খাবার ঘরে উকি দিয়ে দেখলাম খাসির মাংস রান্না হচ্ছে । তো হয়ে যাক ভূড়িভোজন । সকলে রাজি । গরম ভাত পেয়ে পেটের ভিতর যুদ্ধ থামতে শূরু করলো । অদ্ভূত রান্না । তৃপ্তিসহকারে হোটেল থেকে বের হলাম । আবারও যাত্রা । প্রথমে আমরা চিম্বুক নামের জায়গাটিতে পৌঁছালাম । উপরে উঠে আমার মনে হলো আমি দার্জেলিং এ আছি । মেঘগুলো আমার গা বেয়ে চলে যাচ্ছে । হাত দিয়ে ধরা যায় ।
কবিতার ভাষায় বলতে ইচ্ছে হলো-
ও মেঘ তোমার বাড়ী কই ?
যাচ্ছ কোথায় উড়ে,
ভিন দেশে এক নাগর আছে
সেই নাগরের ধারে ?
অনেক ছবি তুললাম । অতঃপর চিম্বুক থেকে প্রস্থান । যাত্রা শুরু হলো নীলগীরির উদ্দেশ্যে । পাহাড়ী পথ ষ্পীড বেশী দেয়া যায় না । ছোট-বড় হাজার হাজার পাহাড় । নীচের দিকে তাকালে ধরে পানি থাকে না । কত ফুট উচুতে আমাদের গাড়ী চলছে ? ৮০০ কিংবা ১০০০ ফুট । একবার পড়ে গেলে খোঁজ পাওয়া যাবে না । রাস্তার পাশে কিছু লোকের জটলা । গাড়ী থামাতে বল্লাম । নেমে এলাম গাড়ী থেকে । জিজ্ঞেস করতেই একজন পাহাড়ী কর্কশ গলায় বললেন এক্সিডেন্ট হয়েছে । শুনা গেলো প্রাইভেট গাড়ীতে চার জন ছিল । সবাই শেষ । একজন শিশু ছিল । আর্মিরা এসে লাশ নিয়ে বান্দরবান হাসপাতালে গেছে ।
খুবই কষ্ট লাগলো । আমরা গাড়ীতে উঠলাম । ড্রাইভারকে বল্লাম, আমরা কি শিক্ষা নিলাম ?
-জি স্যার । সাবধানে চালাতে হবে ।
-গুড ।
গাড়ী চলতে থাকলো । রাস্তার ধারে একজন পাহাড়ী এক ছড়ি কলা নিয়ে দাড়িয়ে আছে । গাড়ী থামালাম । জিজ্ঞেস কররাম কলা কত?
দেড়শত টাকা ।
-কম দিবে না ?
-একদাম বাবু ।
কাঁচা হলুদ রং এর কলা । একনজরে আমি গুনে ফেল্লাম ১৫০টির উপরে হবে । নিয়ে নিলাম । ঔষধমুক্ত তো ! আমরা একেক জন ৪/৫টা খেয়ে ফেল্লাম , খুবই মিষ্টি । অতঃপর আমরা আমাদের কাংখিত নীলগীরি এসে পৌছালাম । চূড়ায় উঠে অভিভূত না হয়ে পারলাম না । এতক্ষণ ভেবেছিলাম আমরা পাহাড়ের পাশ দিয়ে যে রাস্তা তৈরী হয়েছে সেটা দিয়ে আসছিলাম । কিন্ত নীলগীরির উপরে উঠে দেখলাম রাস্তাটা বানানো হয়েছে পাহাড়ের চূড়া দিয়ে । নীলগীরির সার্থকতা খুজে পেলাম । সমস্ত পাহাড় নীল চাদরে ঢাকা । পাহাড়গুলি সত্যি নীল । মেঘগুলি অনেক নীচ দিয়ে চলে যাচ্ছে । অন্য এক বাংলাদেশ । কেউ না দেখলে বুঝতে পারবেন না বাংলাদেশে আছি না অন্য কোথাও । লোকজন নেই । পাহাড় আর পাহাড় ।এটি আর্মির তৈরী । একটি রেষ্ট হাউজ আছে । ১৪/১৫টি রুম রয়েছে । পারমিশন নিতে হয় আর্মি হেড কোঢার্টার থেকে । এখানে সুন্দর একটি কটেজ তৈরী করা হয়েছে । উদ্বোধন করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ । এখানে একটি হেলিপোর্ট রয়েছে । আমরা এমন প্রাকৃতিক লীলাভূমি অবলোকন করে কিছু ফার্ষ্ট ফুড খেয়ে ফিরতে থাকলাম ।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের কথা মনে পড়ে গেল ‘‘আকাশে হেলান দিয়ে রই, পাহাড় ঘুমায় ঐ আকাশে---’’ ।