আহমেদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা ইউরোপ সফরে বিশ্ব-শান্তির ডাক দিলেন
এইদেশ সংগ্রহ , বুধবার, ডিসেম্বর ১২, ২০১২


বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের আধ্যাত্মিক নেতার ইউরোপীয়
পার্লামেন্টে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বশান্তির আহ্বান

২০১২ সনের ৪ ডিসেম্বর নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নেতা ও পঞ্চম খলীফা হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সংবাদ কক্ষে অনুষ্ঠিত, সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের উত্থাপিত বিভিন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে খলীফার ভাষণের পূর্বেই এই সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম সংস্থার প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্বে ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কিত বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ বলেন ইসলামের মূল শিক্ষা হলো ‘শান্তি’। তিনি বলেনঃ “ইসলামের শান্তির বাণী হচ্ছে সার্বজনীন, এ কারণেই আমাদের আদর্শ ও মটো হলো, ভালোবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে”।

স্পেনিশ গণমাধ্যমের এক প্রতিনিধির প্রশ্নের উত্তরে হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ বলেন যে, সূচনাতে সকল প্রধান ধর্মই শান্তির শিক্ষাই দিয়েছে আর এ কারণেই সত্যিকার মুসলমানরা বিশ্বের সকল নবী-রসূলের প্রতি বিশ্বাস রাখে। তিনি বলেন , প্রত্যেক নবী একটি বাণী সহ এসেছিলেন আর তা হচ্ছে খোদা এক ও অদ্বীতিয়।

মালটা গণমাধ্যমের এক প্রতিনিধি কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ বলেন যে, আহমদী মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে খোদার নিকটতর করা এবং পরস্পরের অধিকার প্রদানের বিষয়ে বিশ্বের মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

হযরত মির্যা মাসরূর আহমেদ বলেন যে আন্ত-ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রচেষ্টায় তিনি সম্প্রতি পোপ বেনেডিক্টের কাছে ব্যক্তি মারেফত একটি পত্র পাঠিয়েছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে যে সকল বিষয় তাদের ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে তা নিয়ে ভাবা উচিত।



ইউরোপীয় পার্লামেন্টে খলীফাতুল্ মসীহ'র ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান
হযরত মির্যা মসরূর আহমদ ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্ব-শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন

৪ ডিসেম্বর ২০১২ তে, নিখিল বিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নেতা এবং পঞ্চম খলীফা, হযরত মির্যা মসরূর আহমদ ব্রাসেল্সের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ৩০টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ৩৫০এরও অধিক অতিথির উপস্থিতিতে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।

এই অনুষ্ঠানটি নতুন উদ্বোধনকৃত ‘ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ফ্রেন্ড্স্ অব্ আহমেদীয়া মুসলিম গ্রুপস’ আয়োজন করে। উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং সহ-সভাপতি হযরত মির্যা মসরূর আহমদকে স্বাগত জানাতে মঞ্চে আসেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট এবং সদস্য (এমইপি) মার্টিন সুল্যও হুযূরের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।


৩৫ মিনিটের ভাষণে হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) ইউরোপীয় ইউনিয়নকে স্বীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান; পশ্চিমা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন বিষয়ে আলোকপাত করেন; আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে সমতার বিষয়ে সমর্থন করেন এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ইসলামের মূল শিক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ বলেন, আধুনিক বিশ্বে অনেকে ইসলামকে এমন এক ধর্ম হিসেবে দেখে যা হিং¯্রতা ও চরমপন্থাকে প্রশ্রয় দেয় এবং তারা এই ধর্মকে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে নৈরাজ্য সৃষ্টির লক্ষ্যে দায়ী মনে করে। তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ একেবারেই অন্যায্য ও ভিত্তিহীন কেননা, ইসলাম শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘শান্তি’ ও ‘নিরাপত্তা’।”

পশ্চিমা দেশগুলোতে বর্ধিত মাত্রায় অভিবাসন সংক্রান্ত চরম উদ্বেগ-উৎকন্ঠা সম্পর্কে খলীফা কথা বলেন।
বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হুযূর বলেন, এ বিষয়টি সমাজে ‘অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা’ ছড়াচ্ছে। হুযূর অভিবাসীদের এবং স্থানীয় লোকদের উভয়কে এই ধরনের অবস্থার জন্য দ্বায়ী করেন, যেখানে অনেক অভিবাসী একীভূত হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্থানীয়দেরকে উত্তেজিত করে, সেখানে স্থানীয় সমাজের কিছু অংশ বহিরাগতদের প্রতি অসহনশীল। তিনি বলেন, এরকম বিভাজনের ফল সুদূর প্রসারী আর তাই তিনি এ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য সকল দলগুলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ বলেন,
“সরকারের এমন নীতি প্রণয়ন করা উচিত যাতে করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করা যায়, যার মাধ্যমে অন্যের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত হানা বা তাদের কোন প্রকার ক্ষতি-সাধন আইন-বহির্ভূত হয়। প্রবাসীদের স্থানীয় লোকদের সাথে একীভূত হওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে কোন দেশে অনুপ্রবেশ করা উচিত আর অন্যদিকে স্থানীয়দের হৃদয় উম্মুক্ত করার জন্য তৈরী থাকা উচিৎ এবং সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা উচিৎ”।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কে হযরত মির্যা মসরূর আহমদ বলেন,
“ইউরোপীয় ইউনিয়নের সৃষ্টি ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি বড় সাফল্য কারণ, এটি এই মহাদেশকে একত্রিত করার একটি মাধ্যম হয়েছে। আর তাই আপনাদের উচিত এই ঐক্য বজায় রাখার জন্য সম্ভাব্য সকল প্রচেষ্টা চালানো। ...স্মরণ রাখবেন, ঐক্যবদ্ধ এবং সবাই মিলেমিশে থাকার মধ্যেই ইউরোপের শক্তি নিহিত। এ ধরনের ঐক্য কেবল আপনাদেরকে এখানে ইউরোপেই শক্তি যোগাবে না বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে এই মহাদেশের জন্য এর শক্তি এবং প্রভাব বজায় রাখার উপায় হবে”।

খলীফা কেবল ইউরোপের মধ্যে সহায়তার কথা বলেননি বরং বিশ্বব্যাপী ঐক্যের আহ্বান জানান। হুযূর বলেন,
“ইসলামী প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে, আমাদের গোটা বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা উচিত। মুদ্রার ক্ষেত্রে পৃথিবীর এক হয়ে যাওয়া উচিত। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব একত্রিত হওয়া উচিত। আর গতিবিধি ও অভিবাসনের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উপযুক্ত এবং ব্যবহারিক নীতি তৈরি করা উচিত যাতে করে বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হতে পারে”।

হুযূর আরো বলেন, আধুনিক বিশ্বে কোন দেশের পক্ষে আর আলাদা থাকা সম্ভব নয় আর এমনকি বিশ্ব-শক্তিসমূহ যেমন, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিদেশী সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোকে শোষণ করা উচিত নয় বরং তাদের উন্নয়নে এবং সাফল্য অর্জনে সাহায্য করা উচিত।

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ আরব বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, যদিও পশ্চিমা বিশ্ব সিরিয়া এবং লিবিয়ার পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে ‘ক্রোধ ও উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে, কিন্তু ফিলিস্তিনের জনগণের সংকটের ব্যাপারে তাদেরকে সে রকম উদ্বিগ্ন মনে হয় নি।


হযরত মির্যা মসরূর আহমদ বলেন,
“এ ধরনের দ্বিমুখী আচরণ বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে মুসলমান দেশের লোকদের হৃদয়ে অসন্তোষ এবং আক্রোশ বাড়িয়ে তুলছে। এই ক্রোধ ও শত্রুতা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং যে কোন সময় ফুঁসে উঠতে পারে এবং বিস্ফোরিত হতে পারে...

এটা সুস্পষ্ট করা দরকার যে, আমি কোন নির্দিষ্ট একটি দেশের সমর্থনে বা পক্ষে কথা বলছি না। আমি যেকথা বলতে চাচ্ছি তা হলো, সকল ধরনের নিষ্ঠুরতা নির্মূল ও বন্ধ করা দরকার, তা যেখানেই বিরাজ করুক না কেন, এখানে এটা বিবেচ্য হওয়া উচিত নয় যে, তা ফিলিস্তিনের জনগণ দ্বারা ঘটিত না-কি ইসরায়েলের জনগণ দ্বারা অথবা অন্য যে কোন দেশের জনগণ দ্বারা সংঘটিত হয়েছে কিনা”।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাঝে ভেটো প্রদানের ক্ষমতার নীতিরও খলীফা সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভোট দেওয়ার ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতা প্রতিহত করার পরিবর্তে সহায়তা দেওয়ার জন্য ভেটো প্রদানের ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে।


হযরত মির্যা মসরূর আহমদ ন্যায়বিচার এবং সাম্যের আহ্বান জানিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। তিনি বলেন,
“সব সময় মনে রাখবেন, কায়েমী স্বার্থ থেকে মুক্ত হয়ে এবং সকল প্রকার শত্রুতার ঊর্ধ্বে থেকে অত্যাচারিত এবং অত্যাচারী উভয়কে সম্পূর্ণরূপে নিরপেক্ষভাবে সাহায্য করা হলেই কেবলমাত্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সকল দলকে সমান প্লাটফর্ম ও সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে শান্তি আসে”।

হুযূরের মূল ভাষণের পূর্বে কয়েকজন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য মঞ্চে আসেন এবং যেভাবে আহমদীয়া মুসলিম জামাত শান্তিপূর্ণ ইসলামী শিক্ষা তুলে ধরেÑ এর প্রতি তাদের শ্রদ্ধার কথা বলেন।

ড. চার্লস ট্যানক এমইপি, ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ফ্রেন্ড্স্ অব্ আহমদীয়া মুসলিম্স গ্রুপের সভাপতি বলেন, ‘আহমদী মুসলমানরা হচ্ছে, বিশ্বে সহিষ্ণুতার এক শ্বাস্বত উদাহরণ’। তিনি পাকিস্তানে আহমদী মুসলমানদের উপর নির্যাতনের নিন্দা জানান এবং বলেন, ‘আহমদীদের ব্রত- ভালবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে’ এটি চরমপন্থী জিহাদীদের জন্য একটি কার্যকর প্রতিষেধক’।

ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ফ্রেন্ড্স অব আহমদীয়া মুসলিম্স গ্রুপের সহ-সভাপতি টুনে কেলাম এমইপি বলেন, তিনি এই অনুষ্ঠান অংশগ্রহণ করছেন কারণ, ‘শান্তির আকাঙক্ষায় যোগদানের’ এটি একটি সুযোগ। তিনি ‘সকল প্রকার সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে প্রত্যাখানের’ জন্য আহমদীয়া মুসলিম জামাতের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বিশ্বব্যাপী জামাতের অগ্রযাত্রায় সহায়তা প্রদানের জন্য অঙ্গীকার করেন।

ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ফ্রেন্ড্স্ অব্ আহমদীয়া মুসলিম্স গ্রুপের সহ-সভাপতি বেরোনেস সারাহ লুডফোর্ড এমইপি যুক্তরাজ্যে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের সাথে তার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেন। তিনি বলেন, আহমদীয়া জামাতের মূলমন্ত্র ‘আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা যা আমাদের এই আধুনিক বিশ্বের খুবই প্রয়োজন’।

ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ফ্রেন্ড্স্ অব্ আহমদীয়া মুসলিম্স গ্রুপের সহ-সভাপতি ক্লোউড মোরায়েস এমইপি বলেন, এই অনুষ্ঠানটি ‘ইউরোপীয় পার্লামেন্টের যে কোন সভায় উপস্থিতির তুলনায় বেশি উপস্থিতি আকৃষ্ট করেছে’।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধিত্বের সভাপতি জ্যাঁ ল্যাম্বার্ট এমইপি বলেন, তিনি আহমদী মুসলমানদের ভোট প্রদানের বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তান সরকারের সাথে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের স্বাধিনভাবে এবং কোন প্রকার বৈষম্য ছাড়াই ভোট প্রদানের অধিকার থাকা উচিত।

‘ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট ফ্রেন্ড্স্ অব্ আহমদীয়া মুসলিম্স গ্রুপ’ এর যাত্রায় স্বীয় আনন্দ প্রকাশের জন্য যুক্তরাজ্যের আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রেসিডেন্ট জনাব রফিক হায়াতও মঞ্চে আসেন।

এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি হযরত মির্যা মসরূর আহমেদের পরিচালনায় সম্মিলিত দোয়ার মাধ্যমে বিকেল ৪টা ৩৫-এ সমাপ্ত হয়। লিঙ্ক