হরতালের সত্যাসত্য ।। পারভেজ আলম
এইদেশ সংগ্রহ , বুধবার, ডিসেম্বর ১৯, ২০১২


‘শব্দ’ লিখতে বসি নাই, আজকে ‘সত্য’ লিখতে বসেছি। সত্য লেখা কঠিন, কারণ সত্য সুন্দর না। সত্য লিখতে অথবা পড়তে ভালো লাগে না। মানুষ সত্যের জগতে বসবাস করে না, শব্দের জগতে করে। শব্দ নির্মাতা তাই কবি হন, নবী হন। কবি হওয়ার ইচ্ছা আমার ছোটকাল থেকে, নবী হওয়ার বাসনা নাই বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু আজকে কবি অথবা নবী কোনওটাই হওয়ার চেষ্টা করবো না। তারচেয়ে বরং সাহস করে সত্যের সাথে নিজেকে এবং আর সবাইকে ঝালিয়ে নেবো। তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একেবারেই কখনো নবী হওয়ার চেষ্টা করবো না সেই কথা দেয়া সম্ভব হইলো না, দুঃখিত।

হরতাল নিয়ে লিখতে বসেছি। কাব্য অথবা দর্শন কপচাতে বসি নাই। সুতরাং সিরিয়াস লোকজন উপরের প্যারা বাদ দিয়া পড়তে পারেন অথবা একবার পড়ে পুরাপুরি অগ্রাহ্য করতে পারেন। তবে কিউরিয়াস লোকজন প্রথম প্যারায় আমার লেখার আলিফ লাম মিম খুঁজে পেলেও পাইতে পারেন। আসল কথায় আসি। ডিসেম্বর মাসটা হরতালেই গেলো। নানান ধরনের হরতাল। হরতাল জিনিসটা এর পুরনো আবেদন হারিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, দিনটা আলোচনায় হাজির হয়েছে এই হরতাল কেন্দ্র করেই। এই মাসে একের পর এক হরতাল হলো, এখনো হচ্ছে, বিএনপি, জামাত, জাগো বাংলাদেশের পরে আমাদের আলোচ্য হরতাল ডেকেছিলো সিপিবি-বাসদ এবং গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। হরতালের ইস্যু ছিলো যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার, জামাতসহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা, গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্যের দাম কমানো ইত্যাদি। বিগত বহু বছর ধরেই হরতাল মানে হলো সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো, মানুষ হত্যার রাজনীতিরই আরেক নাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এ জাতীয় সহিংসতা, লাশের রাজনীতির প্রতি জনগণের সহানুভূতি ছিলো, সেইটা কপি পেস্ট করেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিগত বছরগুলাতে একের পর এক হরতালের রেকর্ড গড়েছে, কিন্তু জনগণের সহানুভূতি পায় নাই। কারণ, এটা স্বৈরাচারী এরশাদের আমল না, এটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। এই সহজ সরল সত্যটা এই দেশের জনগণ বুঝলেও গণতান্ত্রিক প্রধান দুই দল বুঝে না বললেই চলে। এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক পন্থা শতভাগ বাহুবলের রাজনৈতিক পন্থা। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এই পন্থাকে পুরাপুরি ব্যর্থ বলার উপায় নাই, কারণ আর কিছু না হউক বাহুবলের শো অফ আর জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা জাহির করাটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে প্রায় বৈধতা পেয়ে গেছে। এই বৈধতা তাদের কেউ দেয় নাই, গায়ের জোরে আদায় করে নিয়েছে। গায়ের জোরেই একিদিনে একদল এদেশের জনগণকে হরতাল পালন এবং অপর দল তা প্রতিহত করার জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে আলাদা আলাদা প্রেস রিলিজ দেন। যদিও হরতাল পালন বা ঠেকানোর কাজে তাদের দলীয় সন্ত্রাসী এবং টাকায় ভাড়া করা জমায়েতই যা ভূমিকা রাখার রাখে। জনগণ এখানে দর্শক মাত্র। এসব হরতালে জনসমর্থনের তাই প্রশ্ন আসে না। কিন্তু গতকালের বামদলগুলার ডাকা হরতালে জনসমর্থনের প্রশ্ন উঠেছে। সহিংসতা, মানুষ খুন আর লাশের রাজনীতির হরতাল হরতাল খেলা এই মাসে একাধিকবার হয়েছে বলেই গতকালের বামদলগুলোর অহিংস হরতাল নিয়ে মানুষের ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকে সমর্থন দিচ্ছেন, অনেকে সরকার সমর্থিত হরতাল বলে সমালোচনা করছেন। কিন্তু হরতাল হলে আসলে এমনই হওয়া উচিৎ এবং এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই আছে এ ব্যাপারে খুব বেশি দ্বিমত করার লোক নাই। ১৮ তারিখের হরতাল আসলেই জনসমর্থিত ছিল কিনা, কিংবা এই হরতাল আদতে আওয়ামী লীগের বি টিমের হরতাল কিনা সেটা বিশ্লেষণ করতে গেলে তাই আমাদের হরতাল ডাকা দলগুলার প্রেস রিলিজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অহিংস হরতালে ধন্যবাদ, বিএনপি জামাতের একে আওয়ামী লীগ সমর্থিত হরতাল বলে সমালোচনা এবং ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলার ‘এ হরতাল জনগণ প্রতিহত’ করেছে জাতীয় দাবির উপর খুব বেশি নির্ভর করার উপায় নাই। আমাদের নির্ভর করতে হবে বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় জনগণের মন্তব্য, ব্লগগুলাতে এবং ফেসবুকে মানুষের মতামত ইত্যাদির উপর। কারণ এর বাইরে জনগণের কোনও আওয়াজ নাই। রাজনৈতিক দলগুলার প্রেসরিলিজ আর যাই হোক জনগণের আওয়াজ বলে দাবি করা যাবে না।

অনলাইনে জনগণের আওয়াজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্মরণাতীতকালে এই সরকারের আমলে ডাকা তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির হরতালগুলো ছাড়া আর কোনও হরতালের প্রতি এতোটা জনসমর্থন দেখা যায় নাই। তবে অনলাইন এবং অফলাইন (মিডিয়ায় প্রচারিত জনগণের সাক্ষাৎকার) মিলিয়ে জনসমর্থন জাতীয় কমিটির ডাকা হরতালগুলাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই হরতালকে সরকার সমর্থিত হরতাল বলে পুলিশি সহযোগিতায় অহিংস হরতাল সফল করানো হয়েছে বলে যারা দাবি করেছেন সেগুলাকেও পাশ কাটানোর কোনও উপায় নাই। মোট সংখ্যা হিসাবে যোগ বিয়োগ করতে পারি নাই কিন্তু হরতাল সমর্থনকারীদের তুলনায় হরতালকে সরকার সমর্থিত বলে সমালোচনাকারীদের সংখ্যাও নেহায়েত কম না। আমি বরং এই দুই ভিন্ন মতকে সমান সমান ধরেই আলোচনা করতে আগ্রহী।

কারণ পক্ষে বিপক্ষে বেশকিছু যুক্তি আছে, যারা গায়ের জোরে কথা বলেছেন তাদেরকে উহ্য ধরেও। হরতালের সমালোচনায় জামাতপন্থীদের অনলাইনে বেশ একটিভ দেখা গেছে। বিএনপিকেও দেখা গেছে। অনেকেই বামদের গায়ের জোর নাই, অথবা পিকেটিং করার মতো পিকেটার নাই এ জাতীয় মন্তব্য করেছেন যেগুলা বিবেচ্য না। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে টাকা খরচ করলে পিকেটার কেনা যায়, কোনও দলের হরতালের প্রতি জনসমর্থনের জন্যে কোনও সূচক হতে পারে না। কেউ কেউ পুরাতন কায়দায় নাস্তিকদের হরতাল বলে দাবি করেছেন এবং ধর্মীয় রাজনীতি ধ্বংসে এই হরতালকে আওয়ামী-বাম যুগ্ম প্রযোজনা বলে দাবি করেছেন। বামদেরকে নাস্তিক বলে জনবিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া অনেক পুরাতন। এই পদ্ধতি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনীতির সময় থেকে ইসলামপন্থীরা ব্যাবহার করে আসছে। বাংলাদেশের বর্তমান বামরা নাস্তিক আইডেন্টিটিকে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে অনেকটাই খারিজ করে ফেলেছেন- ইসলামপন্থীদের এই ধরনের প্রোপাগান্ডা মোকাবেলা করতেই। সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ‘ইনশাল্লাহ হরতাল সফল হবে’ বলে যখন আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তখন বাম রাজনীতি যে ইসলাম বিরোধিতা না সেইটা বুঝানোর সূক্ষ্ম ইচ্ছা তার থাকে বলেই মনে করি। এমনকি সতর্কতা স্বরূপ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের বদলে ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবি করাটাও বামদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা হিসাবেই আমি গণ্য করবো। তবে ‘নাস্তিক’ শব্দটার মাথায় কাঠাল ভেঙে বাংলাদেশের বর্তমান বাম রাজনীতিকে প্রতিহত করতে যাওয়ার তরিকা এই আমলে খুব একটা কাজের কাজ হবে বলে মনে হয় না। অতি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সেই অতীত আমরা পেছনে ফেলে এসেছি বলেই আমার বিশ্বাস, যদিও অসাম্প্রদায়িকতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এখনো পুরাপুরি আদায় হয় নাই। এবং ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলা নিষিদ্ধ হলেই এ দেশ অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে সেটাও সন্দেহের উর্ধ্বের কোনও বিষয় না, তবে এটা নিয়া আলোচনা আপাতত করবো না।

এর বাইরে অনলাইন আওয়ামীপন্থীদের দেখা গেছে হরতালের আগে এর বিরোধিতা করতে, এই খাতিরে যে বামদের সফল হরতাল করার ক্ষমতা নাই, সুতরাং তাদের ব্যর্থ হরতালকে জামাত প্রচার করবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপরীতে জনতার রায় বলে। কিন্তু হরতাল সফল হওয়ার পরে এবং হরতালের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামাতপন্থীদের সরকারি সহযোগিতার অভিযোগ আসার পর দিনশেষে তারা মোটামুটি হরতালে সমর্থন দিয়েছে। তবে খোদ বামপন্থীদের মাঝেই একটা অংশ এই হরতালের মধ্য দিয়ে সিপিবি বাসদ আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা পালন করেছে- এহেন অভিযোগ তুলেছে যার খণ্ডন করতে বামপন্থীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। এর বাইরে হরতাল সমর্থনকারী একটা বড় অংশের দেখা মিলেছে যারা কোনও দলের সমর্থক না। ১৮ তারিখ বিকালে অতি আগ্রহী কাউকে কাউকে নিজের পরিবারের মামা, চাচা, বাবাদের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাস উল্লেখ করে বামপন্থীদের সাথে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজতেও দেখা গেছে, কাউকে দেখা গেছে সরাসরি বাম রাজনীতিতে রিক্রুট হওয়ার বাসনা প্রকাশ করতে। এমনিতে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষই নিজের পরিবার অথবা আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বাম সমর্থক খুঁজে পাবেন, কারণ অতীতে বাংলাদেশে বামরাই দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তি ছিলো। কেউ কেউ শ্রেফ বামদের প্রশংসা করে এই হরতাল থেকে অন্যদলগুলার শিক্ষা নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন।

এক্ষেত্রে আমার নিজের বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা করা জরুরি মনে করছি। এক্ষেত্রে বাম ঘরানার ভেতরে যে কিছু সমালোচনা আছে তা আগেই উল্লেখ করেছি এবং সেগুলা আলোচনা করেই আমি আমার অবস্থান জানাতে চাই। বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত ছোট কিছু বাম সংগঠন বা বামপন্থী ইন্ডিভিজুয়ালদের একটা পুরাতন অভিযোগ আছে যে সিপিবি আসলে আওয়ামী লীগের বি-টিম। অথবা সিপিবি ইতিহাসে বারবার আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্য করে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ক্ষতি করেছে। এই ইতিহাসের সত্যতা বিষয়ে আমার খুব বেশি দ্বিমত নাই। সিপিবি পাকিস্তান আমলের বড় সময়ই নিষিদ্ধ সংগঠন ছিলো, এর নেতাকর্মীরা অনেকেই আওয়ামী লীগ অথবা ন্যাপের ভেতরে থেকে রাজনীতি করতেন। পাকিস্তান আমলে এ দেশে যে জাতীয়তাবাদী মধ্যবিত্ত্ব শ্রেণীর বিকাশ তার রাজনৈতিক উইংয়ের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ থাকলেও বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উইংয়ে ছিল মূলত সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জগতে বাম আধিপত্য বা বামঘেঁষা চরিত্র এই সুবাদেই এখনো টিকে আছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে এটাকে আমি নেতিবাচক হিসাবে দেখি না খুব একটা, যদিও নিজ পরিচয়ে সিপিবি বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে যায় নাই তাদের আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে। তারা বরং আওয়ামীলীগের হাতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে তাতে সমর্থন দেয়াটা এবং আওয়ামী লীগের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই সঠিক কাজ বলে মনে করেছে।

সিপিবির বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগ ছিলো বরাবরই প্রগতিশীল মধ্য বাম বুর্জোয়াদের শক্তি। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে সিপিবি ছাড়াও আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার ট্রাডিশন সেই মতিয়া চৌধুরীদের আমলেও ছিল, এখনকার নুরুল ইসলাম নাহিদদের আমলেও আছে। কিন্তু একাত্তরের পরে সিপিবির দরকার ছিলো একটা শক্তিশালী বিরোধীদল হিসাবে আবির্ভূত হওয়া, যেটা না করে তারা আওয়ামী লীগের সাথে গাটছাড়া বেঁধেছিলো। অন্যদিকে আওয়ামীলীগের ভেতরকার কট্টর বাম অংশটা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে জাসদ গঠন করেছিলো যার একটা অংশ পরবর্তীতে জাসদের লাইনকে অস্বীকার করে বাসদ গঠন করে। আওয়ামী লীগের সাথে তাই বাসদ এবং সিপিবির সম্পর্ক অতি প্রাচীন।

সিপিবির বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। বিভিন্ন সময়ে তার ভাষণ, বক্তৃতা শুনেছি। নানান লেখা ও সাক্ষাৎকার পড়েছি। তার লেখা একটা পুস্তিকার উপরে একটা পাঠচক্র পরিচালনা করার দায়িত্ব পড়েছিলো একবার। একজন দক্ষ সাংগঠনিক এবং ক্যারিশমাটিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি শ্রদ্ধার দাবি রাখেন। কিন্তু তার বিভিন্ন বক্তব্য থেকে তাকে বরাবরই আমার কাছে কিছুটা আওয়ামীঘেঁষা বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারত বিষয়ে তার বিশ্লেষণের সমালোচনা করেছি বিভিন্ন সময়ে। বর্তমান আওয়ামী লীগ এবং বর্তমান সরকারের অনেকেই তার এককালের রাজনৈতিক কলিগ কিংবা বন্ধুবান্ধব। সদ্য সভাপতির দায়িত্ব নিয়েই তিনি আওয়ামী লীগের ভেতরে প্রভাব খাটিয়েছেন অথবা আওয়ামী লীগের সাথে মিলে মিশে এই হরতাল করেছেন- এই সন্দেহ হওয়া তাই অমূলক নয়। নিজের এই সন্দেহ যাচাই করতে গিয়াই ইতিহাস থেকে অনেক ঘটনা তুলে আনতে হবে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে যারা চেনেন, তারা জানেন যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি একজন স্বনামধন্য ও বর্ষীয়ান ব্যক্তি, যদিও বর্তমানের লীগ বনাম বিএনপির মেরুকরণের রাজনীতিতে তিনি বর্তমান প্রজন্মের কাছে অতোটা পরিচিত না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সিপিবি-ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন। সেসময় তিনি ছিলেন মাত্র ২৩ বছরের তরুণ। একাত্তরের চিঠি’ বইটাতে তার লেখা একটা চিঠি আছে, চিঠিটা লিখেছিলেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ আবদুল কাইয়ুম মুকুলকে। সেই চিঠিতে শহীদ সহযোদ্ধাদের প্রতি এবং পুরো মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার যে আবেগ ধরা পড়ে সেইটুকু না বুঝতে পারলে আওয়ামী লীগের প্রতি তার অবস্থান বুঝা যাবে না। এটা লোকমুখে কথিত আছে যে তিনি বঙ্গবন্ধুর শিষ্য মনে করতেন নিজেকে, অথবা শিষ্যই ছিলেন। এটা যদি অতিরঞ্জিতও হয় তাহলেও একাত্তরে জয় বাঙলা– জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানটাকে তিনি নিজের করে নিয়েছিলেন বলে সহজেই দাবি করা যায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি তার অসীম ভক্তি বিভিন্ন সময় ধরা পড়ে। সিপিবির অফিসে তার নিজের অফিস রুমে মার্ক্স এবং লেলিনের সাথে শোভা পায় বঙ্গবন্ধুর ছবি। কিন্তু এই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমই আবার বঙ্গবন্ধুর আজীবন ডাকসু সদস্য পদ বাতিল ঘোষণা করেন (উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকসুর ভিপি ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম), যখন স্বাধীন বাংলায় ভিয়েতনামের উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা নিহত হয়। স্বাধীন বাংলায় মিছিল করতে গিয়ে নিজ দেশের পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা সেটাই প্রথম। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যার হাত সন্তানের রক্তে রঞ্জিত তিনি নিজেকে জাতির পিতা দাবি করতে পারেন না, সুতরাং আগামীকাল থেকে কেউ তাকে জাতির পিতা বলবেন না। এই ঘোষণায় যতই তীব্রতা থাকুক, ভুলে গেলে চলবে না যে তিনি আদতে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসাবেই গণ্য করেছেন। এমনকি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম প্রতিবাদ মিছিলটা নিয়ে যখন তিনি মাঠে নামেন তখন এটাও বোঝা গিয়ছিল যে বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য কথিত শিষ্যের তুলনায় সেসময়ের ছাত্রনেতা সেলিম গুরুভক্তিতে অনেক এগিয়ে ছিলেন।

গুরুভক্তির কাহিনী বলতে গেলেই আমার মাথায় মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন শেখ ফয়জুল্লাহর গোরক্ষ বিজয়ের কথা মাথায় আসে। গোরক্ষনাথ নিজের গুরু মীননাথকে পতন থেকে রক্ষা করেছিলেন। মহাগুরু মীননাথ শেষ জীবনে যখন ভুল করছেন তখন তার ভুল ধরিয়ে দিয়ে তা শোধরাতে সাহায্য করেছিলেন গোরক্ষনাথ। এ কারণো তার এই বিজয়কে নাথ সাহিত্যে মহিমাম্বিত করা হয়। গুরুকে জয় করাতো যা তা কথা না, গুরুর পরাজয় যে নিজেরই পরাজয়, মানুষের পরাজয়। আর গুরু বিজয় শত সাম্রাজ্য বিজয়ের চেয়েও বেশি মহৎ। এইটাই গোরক্ষ বিজয়ের মূল কথা। গুরু পতিত হয়েছে এই বলে গোরক্ষনাথ গুরুকে ল্যাং মারতে পারতেন, আমাদের এই আধুনিকতাবাদী সময়ে হলে হয়তো তাই করতেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের বামদের মধ্যে গুরুকে ল্যাং মেরে শিষ্যের নিজেরই গুরু হয়ে ওঠার প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। এ কারণে এ দেশে বাম রাজনীতিতে নেতার যেমন অভাব নাই, বুদ্ধিজীবীরও অভাব নাই, অভাব আছে কর্মী ও সমর্থকের। ফলে বামদের মধ্যে ঐক্যের বদলে ভাগ হয় বেশি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তাই তাকে ভক্তি করলেও গোরক্ষনাথের মতো গুরুর ভুলের প্রতিবাদ করতে ভোলেন নাই। আবার প্রতিবাদ করেছেন বলে এবং গুরুর টাইটেল কেড়ে নিতে চেয়ছেন বলে তার হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও ভোলেন নাই। অথচ শেখ মুজিবের চারপাশে ভিড় করে থাকা অতিভক্তিসমৃদ্ধ চোরের দল সেসময় হয় দালাল মোস্তাকের দলে গিয়ে ভিড়েছে অথবা নিজের জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত ছিলো। কিন্তু আমাদের এখানে সবচেয়ে বেশি শেখার আছে যা তা হচ্ছে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার গুরুকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন নাই। গুরু ও শিষ্যের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম এখানে এক ছিল না। সিপিবি সে সময় বাকশালে যোগ দিয়ে একক প্লাটফর্ম করার স্বপ্ন দেখেছিল বটে, কিন্তু সেটা যে ভুল ছিলো এটা তারা এখন স্বীকার করে।

যে কথা বলতে চাইছি তা হচ্ছে যে যেই আওয়ামী লীগকে সিপিবি প্রগতিশীল বুর্জোয়া শক্তি বলে গণ্য করতো সেই আওয়ামী লীগ এখন আর নাই, অথবা যেই নেতাকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গুরু গণ্য করতেন সেই গুরুও এখন আর জীবিত নাই। এ দেশের এখনকার তরুণ বাম’রা আওয়ামী লীগকে আর প্রগতিশীল বুর্জোয়া শক্তি বলে গণ্য করেন না। কিন্তু সিপিবি কি এখনো তা করে? অথবা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কি করেন? এই অভিযোগ আছে যে সিপিবি এখনো এই লাইনে আছে। হরতাল বিষয়ে যেসব বামপন্থী প্রশ্ন তুলেছেন তাদের অভিযোগের সূরই এই রকমই। এই অভিযোগ ধরে আলাপ করতে গেলে যেটা আগে মাথায় আনতে হবে তা হচ্ছে যে সিপিবি বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে অংশ নেয় নাই, যদিও বৃহত্তম বামদল হিসাবে সেই সুযোগ তাদের ছিলো। এক্ষেত্রে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নিজের অবস্থান কি? একটা সাক্ষাৎকার থেকে তার খোজ নেয়ার চেষ্টা করবো। মহাজোটে কেনো যোগ দেন নাই তার ব্যাখ্যা করতে গিয়া তিনি বলেন “আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের একটি জোট গঠনের মতো অবস্থা আওয়ামী লীগ রাখেনি। একটি সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মধ্যবাম নীতি নিয়েছিল। তখন আমাদের সঙ্গে তার দূরত্ব কম ছিল। আর এখন আওয়ামী লীগের নীতি হয়েছে মধ্য ডান। আর আমরা তো বামে রয়েছি। আমরা পজিশন পরিবর্তন করিনি। আওয়ামী লীগ করেছে। আওয়ামী লীগ যতদিন এ অবস্থানে থাকবে ততদিন তাদের সঙ্গে আমাদের কোন জোট গঠন আওয়ামী লীগই অসম্ভব করে রেখেছে”।

অর্থাৎ, ডান বামের সরল মেরুকরণ হলেও এবিষয়ে তিনি নিশ্চিত যে যেই আওয়ামী লীগকে তিনি ও তার দল বন্ধু মনে করতো সেই আওয়ামী লীগ এখন নাই। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে আওয়ামী লীগের নেতা অনুযায়ী এই দলটার চরিত্র পাল্টায়। সোহরাওয়ার্দীর আওয়ামী লীগ এক রকম ছিলো, বঙ্গবন্ধুরটা আরেক রকম, আর এখন শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আরেক রকম। তার এই চিন্তা এবং সিপিবির মহাজোটে যোগ না দিয়ে বিকল্প বাম জোট গড়ার যে প্রচেষ্টা তা থেকে অন্তত এটুকু আন্দাজ করা যায় যে দৃশ্যমান কোনও জোট বর্তমান আওয়ামী লীগের সাথে গড়তে সিপিবি আগ্রহী না।

অদৃশ্য কোনও কৌশলগত ঐক্য তারা গড়তে পারে কি? যেহেতু অদৃশ্য ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে তাই এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার কোন উপায় নাই। সেইসাথে অদৃশ্য ঐক্য বিষয়ক অভিযোগকে সিরিয়াসলি আমলে নেয়ারও উপায় নাই। তবে আলোচনার খাতিরে এই লেখায় সেই সম্ভাবনা নিয়েও আমি আলাপ করতে আগ্রহী। কিন্তু আমার আসল আলাপের জায়গায় অন্যখানে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আনু মুহাম্মদ, খালেকুজ্জামানরা বাংলাদেশের বরেণ্য বাম রাজনীতিবিদ। ওনাদের বিপক্ষ মতাবলম্বীরাও সুস্থ ধারার রাজনীতিবিদ হিসাবে ওনাদের শ্রদ্ধা সম্মান করে থাকেন। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তাদের নেতৃত্ব বিগত বছরগুলার শুরুতে নতুন প্রজন্মের মাঝে এবং পরবর্তিতে সমসাময়িক লিবারাল ডেমোক্রেটদের মাঝে এবং সুশীল সমাজ বলে পরিচিতদের মাঝে আশা ও আস্থার জন্ম দিয়েছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ১৮ তারিখের হরতালে জনসাধারণ ও গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকাকে মোটা দাগে সেই আশা ও আস্থার প্রকাশ বলে অভিহিত করা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের হয়ে হরতাল করে দেয়ার যে সন্দেহ জেগেছে তার কী হবে?

আমি বলি তার হিসাব আমরা করবো এই দেশের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনার জায়গা থেকে, দিনশেষে মোটা দাগে লাভ এবং ক্ষতির হিসাব করে। সেইসাথে আরেকটা জরুরি প্রশ্ন আছে, যাতে আমাদের বাম নেতাদের সমালোচনা করার সাথে সাথে নিজেদের সমালোচনার জায়গা খোলা রাখতে হবে। আমরা গুরুভক্তি ঠিকমতো করছি তো? অতিভক্তি করছি না তো? অথবা গুরুদের ল্যাং মেরে নিজে উপরে উঠতে চাইছি না তো? মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমরা বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে পারেন নাই, আমরা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমদের বাঁচাতে পারবো তো?

চলবে…

লেখক: ব্লগার ও রাজনৈতিক কর্মী

উন্মোচন-এ প্রকাশিত
http://www.unmochon.com/2012/12/19/44138.html