‘জামদানী’ তুমি কার ?
লায়লা আফরোজ , বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১২



ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত-বাংলাদেশ একই সীমান্ত ভাগ করে, আমাদের তিন দিক ঘিরে আছে ভারত, আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। নানা কারণে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে যেতে হয়, ভ্রমন-শিক্ষা-চিকিৎসা-ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আরও অনেক উপলক্ষে। স্বল্প খরচে, কম বৈদেশিক মূদ্রা ব্যয়ে, অতি কম সময়ে, অতি অল্প আয়েশে বিদেশ ভ্রমণের এমন সুবর্ণ সুযোগ আর হয় না! ১৯৮৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আমি ৪০ বারেরও বেশী ভারত ভ্রমন করেছি। দার্জিলিং-কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালুরু হয়ে কর্নাটকা, দিল্লী-মুম্বাই থেকে ড্রীম-স্পট ‘গোয়া’ পর্যন্ত! কী দেখার নেই ভারতে, পাহাড়-সমূদ্র-মরুভূমি-বরফ, কী চাই? এক ভারতে এর সবই বিদ্যমান। অতএব, ফুরসৎ পেলেই ‘চলো কলকাতা’ !

প্রতিবেশি ক্ষুদ্র দেশ হোলেও জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে আমাদের ‘কঞ্জ্যুমার’ বেশি অথচ, উৎপাদন কম। ফলে, রসুন-পেঁয়াজ-মসুর ডাল থেকে শুরু করে ‘লেগুনে’ চাষের ‘রুই-কই’ পর্যন্ত আমাদের আমদানি করতে হয় মূলতঃ ভারত থেকে। সঙ্গত কারণেই, ভারতের সব থেকে বড় মার্কেট হচ্ছে- বাংলাদেশ। সব সময় যে আমরা Uniform Customs for Documentry Credit(UCPDC) বা ‘আন্তর্জাতিক-বাণিজ্য আইনের’ শর্তাবলি মেনে চলি, তাও নয়! কখনো প্রখর দিনের আলোয় ডাঙা দিয়ে পায়ে হেঁটে, কখনো বা রাতের আঁধারে পাহাড় গড়িয়ে অবিরত পণ্য প্রবেশ করে আমাদের দেশে। কাঁটা তারের বেড়া বা গুর্খা সৈনিকের তাক্‌ করা গুলি কোনটিই এই অব্যাহত অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করতে পারেনি। মোদ্দা কথা, যেখানে প্রয়োজন বড় বালাই, সেখানে জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য! এটিই রূঢ় বাস্তবতা।

কিন্তু সেই প্রথমবার ভারত ভ্রমনের দিনটি থেকেই আমি একটি বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি, আর তা হল, ভারতের কোথাও বাংলাদেশের কোন পত্র-পত্রিকা পাওয়া যায় না, টিভি চ্যানেল তো দূরস্ত্‌! যে ক’দিন সে-দেশে অবস্থান করি, সে ক’দিন নিজের দেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকি! এখন অবশ্য রোমিং সিস্টেমের বদৌলতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তাও মুষ্টিমেয় সামর্থ্যবানের জন্য, কিন্তু ‘নো নিউজ চ্যানেল’, নো আদার প্রডাক্ট (ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং প্রতিবেশী দেশ হওয়া সত্বেও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ প্রতশ্যার চেয়ে অনেক কম)! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-কেন এই ‘ব্রুটাল ট্রেড ইমব্যালেন্স’ ? এটা কি ভারতের ‘বিগ-ব্রাদার এ্যাটিচ্যুড’, না দিল্লির দাদাগিরি? কলকাতার কবি শুভদাশ গুপ্ত যেমন তাঁর কবিতায় আক্ষেপ করে বলেছেন-‘দিল্লির মসনদে যারা বসে আছেন..’।
সমাজতন্ত্রে-দীক্ষা নেওয়া আমার অ-কৃতদার বড়ো ভাই, যিনি শ্রেণীহীন সমাজ-ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে জীবন শেষ করে দিয়েছেন, যিনি জীবন-যাপনে একজন সাচ্চা প্রলেতারিয়েত ছিলেন, যিনি ‘গোর্কীর’ আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে বলতেন-‘বিপ্লব আর বিবাহ পরস্পর-বিরোধী’ এবং যিনি এই সেদিনও রুডিয়ার্ড় কিপলিং-এর ‘কিম’ এবং চার্লস ডেকেন্সের ‘ওলিভার ট্যুইস্ট’ পড়ে গোপনে হাতের তালুতে চোখের জল মুছতেন, সেই তিনি প্রতি ১লা মার্চ,জন্মদিনের দিন ভোরে আমার হাতে ৫০০ টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়ে বলতেন-‘একটা সুন্দর দেখে লাল শাড়ী কিনে নিস’। যে মানুষটি কখনো সংসার করেন নি, তাঁর কাছে সুন্দরের সংজ্ঞা ছিল ‘লাল’! ফলে, কৈশোরোত্তীর্ণ বয়স থেকেই আমার প্রিয় রঙ লাল এবং প্রিয় পোশাক শাড়ী। তারপর, যখন একটু বয়স বাড়লো, ‘ছায়ানটে’ গেলাম, তখন সান্‌জীদা আপা রবীন্দ্র-সঙ্গীত শেখানোর ফাঁকে কানের মধ্যে মন্ত্র দিয়ে দিলেন, ‘শাড়ী পরবে, বাঙালী নারীর পোশাক শাড়ী, সালোয়ার-কামিজ পাকিস্তানীদের পোশাক’! সেই থেকে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ অর্থাৎ বছরের বারো মাসই আমার প্রিয় পরিধেয়, শাড়ী! কতো রকমের, কতো ধরণের শাড়ীই না এক জীবনে পরা হলো!

আমার প্রিয় শাড়ীর তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে ‘মসলিন’ তারপরেই ‘জামদানী’র স্থান। দু’টোই চরম সুন্দর, চরম অভিজাত, চরম মূল্যবান, চরম ভঙ্গুর এবং চরম পল্‌কা! অভিজাত মসলিনের সীমাহীন অহংকারী রূপের প্রতি আমার যেমন দূর্ণিবার আকর্ষণ তেমনি, জামদানীর কারুকার্যের ছোঁয়ায় আমি আজো দিশেহারা হই! আমি তো কোন্‌ ছার, শতাব্দীর পর শতাব্দী এই ‘দুই সহোদরা’ ইংরেজ-ফরাসী-পর্তুগীজসহ সকল জাতের মানুষের তন্দ্রা-হরণী এবং আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

কৌতূহলের বশবর্তী হয়েই ঢাকার অদূরে জামদানী-পল্লীতে গিয়ে দেখেছি, কী অ-বর্ণণীয় পরিশ্রম ক’রে তাঁতীরা এক একটি শাড়ী বোনে! সেই কষ্ট স্ব-চক্ষে দেখার পর, দীর্ঘ দিন এক ধরণের অপরাধবোধ আমাকে তাড়িত করেছে! আজো আমি জামদানী কিনি, তবে মনকে প্রবোধ দিই এই বলে যে-ওরা স্বপ্ন বোনে, আর আমি ওদের স্বপ্ন কিনি, পণের মূল্যে! একটি মামূলি জামদানী শাড়ীর সর্বনিম্ন মূল্য ৩৫০০ টাকা, যা দিয়ে কমপক্ষে ৫টি ভালো সুতি শাড়ী কেনা যায়। আবার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দামের জামদানীও দেখেছি, যাতে ‘গোল্ড-ওয়াশ জরী’ ব্যবহার করা হয়েছে। আমার অবশ্য সেই শাড়ীটিকে একটি চমৎকার শিল্পকর্ম বলে মনে হয়েছে! কিন্তু ঐ শাড়ীটি নিজে পরবার কথা, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি! সেই সাথে আমার মনে একটি প্রশ্নেরও উদ্রেক হয়েছে অসংখ্যবার-কারা পরে এই শাড়ী? যে বা যারাই পরুক, তারা নির্ঘাৎ অপরাধী। যে দেশের মানুষ ওষুধের অভাবে, খাদ্যের অভাবে রাস্তায় উপোষ করে মরে সে দেশের মানুষের আর যাই হোক, এ ধরণের ‘বিলাসিতা’ এক্কেবারেই শোভা পায় না! যদিও শুনতে পাই-আমাদের এক নেত্রীর নাকি লক্ষ টাকা দামের ফ্রেঞ্চ-শিফন ছাড়া চলেই না! হায় সেলুকাস !

বছর কয়েক আগে, আমাদের সেই জামদানীকে কলকাতার বাজারে আবিষ্কার করে আমি তো অবাক! প্রথমে ধন্দ লেগেছিল অতুলনীয় নক্‌শার বাহার দেখে! কিন্তু পরে যখন দোকানী আমাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন, তখন আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম-‘এ কি করে সম্ভব’? জবাবে দোকানী বলেছিলেন-ঢাকা থেকে কারিগর গিয়ে ওখানে জামদানী বোনে। মোটিফ, টোন, টেক্সচার, বুনন-রীতি আদি ঢাকাই জামদানীর মতোই তবে, ডিজাইন এবং ফেব্রিক সম্পুর্ণ ওদের নিজস্ব। ফলে, আমাদের ট্র্যাডিশনাল জামদানীর চেহারা থেকে ওদের তৈরি জামদানীর চেহারায় ভিন্নতা স্পষ্টতই দৃশ্যমান। সে সময় চারিদিকে কেবল ‘ফিউশন, আর ফিউশন' ধ্বনি, আমি ভাবলাম যাঃবাব্বা,এখানেও ‘ফিউশন’! আর, এখন শুনছি ফজলী আম এবং নক্‌শী কাঁথার সাথে জামদানীরও পেটেন্ট দাবি করছে ভারত (ইতোমধ্যে পারমিশন পেয়ে গেছে কি?)! কিন্তু, এ কি করে হয়? জামদানী নামের আগে যে ‘ঢাকাই’ শব্দটা ট্রেড–মার্ক হয়ে জুড়ে আছে, কয়েক শতাব্দী ধরে! ‘ঢাকাই জামদানী’ যে আমাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ! আমার মনে হয়, জামদানীকেও যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘সখি তুমি কার? জামদানী বলবে, ‘ঢাকার, ঢাকার’! এমনিতেই উল্লিখিত পণ্য ৩টি আমাদের দেশে অত্যন্ত চড়া দামে বিকোয়, যা সাধারণের নাগালের বাইরে! আর পেটেন্ট করলে এক্সপোর্ট-আইটেম ‘ইলিশের’ মতো ঐ পণ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে আমাদের কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাইতে হবে-‘আমার বলার কিছু ছিল না, চেয়ে চেয়ে দেখেলাম তুমি চলে গেলে’! এতো দুঃখের মাঝেও রবীন্দ্রনাথ বুড়োটা সামনে এসে দাঁড়ান, আর বলেন-‘এ জগতে হায় সেই বেশী চায়, আছে যার ভুরি ভুরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’!
বছর কয়েক আগে,আমেরিকা আমাদের ‘নিম’ গাছের পেটেন্ট দাবী করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে! আমার বিশ্বাস এদের মিশনও ব্যর্থ হবে, আর তাই বলি-‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’-(এই রে, আবার রবীন্দ্রনাথ! হায় রবীন্দ্রনাথ, আপনাকে নিয়ে যে কি করি)!!

লায়লা আফরোজ, আবৃত্তিকার, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।
ঢাকা, ২০শে ডিসেম্বার, ২০১২