দেখতে দেখতে একটি বছর পার হয়ে গেল , রাজ্জাক ভাইয়রে স্মৃতি
ফকির আবদুর রাজ্জাক , শনিবার, ডিসেম্বর ২২, ২০১২


আবদুর রাজ্জাক আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে অনন্য সাধারণ এক নেতার নাম। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পরে একজন মাত্র নেতাই বিস্ময়কর সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী হতে পেরেছিলেন_তিনি সদ্যপ্রয়াত আবদুর রাজ্জাক। গত ২৩-১২-২০১১ ডিসেম্বর তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর কিডনি ও লিভারের অসুখ এমন এক পর্যায়ে গিয়েছিল যে, তাতে হাসপাতালের ডাক্তাররা সব আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত লিভার প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। কেননা অপরেশনের ধকল সইবার মতো শারীরিক অবস্থা তাঁর ছিল না। ডাক্তাররা চেষ্টা করেছিলেন অপারেশনের ধকল সইবার মতো শরীরের অবস্থা ভাল করার জন্য, কিন্তু তাতেও কোন অগ্রগতি না হওয়ার লাইফ সাপোর্টে দু'দিন রাখার পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শেষ পযন্ত তাঁর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে আবদুর রাজ্জাকের অসুখ ও চিকিৎসার ব্যাপারে যে খবর প্রকাশ পেয়েছিল, তাতেই দেশের সচেতন মানুষ আশঙ্কা করেছিলেন আবদুর রাজ্জকে বাঁচানো হয়ত সম্ভব হবে না। অথচ ৬৯ বছর বয়স তুলনামূলকভাবে খুব বেশি ছিল না। এর মধ্যে তাই অনেকেই বলেছেন, আবদুর রাজ্জাকের অকালমৃত্যু হয়েছে।
'প্রতিটি সৃষ্ট জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে'_এই মহাসত্য পবিত্র বাক্যের কখনই হেরফের হবে না। তবু কেন জানি কারও মৃত্যু মানুষ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে না। আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যু অনেকের কাছে কল্পনার অতীত হলেও এটাই বাস্তবতা।
আবদুর রাজ্জাক বাঙালীর রাজনৈতিক পরিম-ল থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর নিজের কোন স্বতন্ত্র রাজনৈকিত নীতি-আদর্শ ছিল না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যে নীতি, আদর্শ ও দর্শন সেটাই ছিল তার নীতি, আদর্শ-দর্শন। যদি বাঙালীর জীবনে কোন দিন সেই নীতি-দর্শন প্রতিষ্ঠা পায় সেদিনই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবদুর রাজ্জাকেরও বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। রাজ্জাক ভাই ছিলেন বঙ্গবন্ধু অন্তপ্রাণ। অন্য অনেক ব্যাপারেই মানুষকে কোন না কোনভাবে কিছু কিছু ৰেত্রে আপোস করতে হয়। কিন্তু আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে আপোস করতে শেখেননি, কোনদিন- কোনকালে। এ ব্যাপারে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে এতটাই অন্ধ ছিলেন যে, রাজ্জাক ভাইয়ের সমবয়সী অনেক নেতাই বঙ্গবন্ধুর কোন কোন কাজের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতেন বা সহনশীল সমালোচনাও অনেকে করতেন। কিন্তু রাজ্জাক ভাইয়ের মুখ থেকে একটি শব্দ কখনও বেরোতে দেখিনি। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখার ও জানার। সাংগঠনিক কাজে তাঁর নির্দেশ-আদেশও পেয়িছি। তবে সেই সময়ের পরিধি ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু আবদুর রাজ্জাককে কাছে পেয়েছি প্রায় চলিস্নশ বছর। কখনও ছিলাম একেবারে ঘনিষ্ঠ, কখনও অনিবার্য কারণে দূরত্বে। কিন্তু কখনই তার সঙ্গে স্থায়ী দূরত্ব হয়নি। দশ বছরের বেশি রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় দূরে অবস্থান করায় স্বাভাবিক কারণেই নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাৰাত কম হয়, সৃষ্টি হয়েছে দূরত্ব।
আবদুর রাজ্জাক তাঁর সমসাময়িক রাজনীতিকদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব। এই উজ্জ্বলতা ছিল তার নীতি-আদর্শের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান, সরলতা, সততা এবং সাংগঠনিক ৰমতার কারণে। তাঁকে নিয়ে ব্যাপক কিছু লেখার অবকাশ এখানে নেই। সে সুযোগ ও মানসিক অবস্থাও নেই। তবে দু'একটি বিষয় উলেস্নখ করব, যা অনেকের জন্যই প্রীতিকর হবে না। ষাটের দশকের গোড়া থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ পর্যনত্ম আবদুর রাজ্জাক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত ও সমর্থক, বঙ্গবন্ধুর মৃতু্য পর্যনত্ম তিনি তা বজায় রেখেছিলেন। এই সময়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন এবং সিরাজুল আলম খানের প্রাণানত্ম চেষ্টা সত্ত্বেও আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে অন্য কোন রাজনৈতিক দলে যেতে রাজি হননি। অথচ আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শে অবিচল ছিলেন বলেই তিনি সমাজতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। বঙ্গবন্ধুর কাছেই তাঁর রাজনীতির দীৰা। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশটি যখন অনেকটা গড্ডালিকাপ্রবাহে চলা শুরম্ন করল, তখন তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জাসদ গঠিত হয়। দলের অভ্যনত্মরে থেকে প্রয়াত শেখ ফজলুল হক মণি সরকারের অনেক নীতি-পদৰেপের ব্যাপারে সমালোচনা করতেন। কিন্তু আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে যেমন কোন দলে যেতে রাজি হননি, তেমনি গঠনমূলক সমালোচনাতেও তিনি রাজি হননি। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের ব্যাপারে তিনি ছিলেন গোঁড়া সমর্থক। এরপর '৭৫-এর ২৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনক নিহত হলে তিনি শেষ চেষ্টা করেছিলেন প্রতিরোধ গড়ে তোলার। কিন্তু প্রথম ধাপেই তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু ছাড়াও শেখ ফজলুল হক মণিকে দারম্নণভাবে শ্রদ্ধা করতেন। ভয়ও পেতেন। আমি যার ঘটনার সাৰী। '৭৪ সালে মণি ভাই আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকা-ে বিরক্ত হয়ে মূল দল ও সহযোগী দলসমূহ থেকে পদত্যাগ করেন। সেই চরম মুহূর্তে একদিন বাংলার বাণীতে রাজ্জাক ভাই এসেছিলেন মণি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। সম্পাদকের রম্নমের ভেতরে উচ্চস্বরে কথাবার্তা শুনতে পেয়ে অন্য এক অছিলায় ওই রম্নমে ঢুকে যা দেখলাম আর শুনলাম তাহলো_ মণি ভাই বলছেন তোর কোন জ্ঞান-বুদ্ধি কখনই হলো না। বঙ্গবন্ধু ছাড়া কিছুই বুঝিস না। তাই বলে কি সত্যি কথা বলবি না? এই কি একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিত্ব? বঙ্গবন্ধুকে কি আমরা ভালবাসি না? বঙ্গবন্ধুর কোন ৰতি হলে কারা বেশি কষ্ট পাবে ইত্যাদি। আসলে আবদুর রাজ্জাক ছিলেন এমনই একজন নেতা, যিনি নিজে ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হবেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু মনোৰুণ্ন হন সে কাজ তিনি করবেন না। এই মহত্ত্বই ছিল তাঁর জীবনদর্শন।
১৯৬৫-৬৭ মেয়াদে আবদুর রাজ্জাক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দু'বার পূর্ব পাকিসত্মান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। একবার ওই সময় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, আরেক বার সভাপতি ছিলেন সৈয়দ মযহারম্নল হক বাকি। '৭৮-'৮২ মেয়াদে তিনি পর পর দু'বার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। এ সময়েও তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। আর স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁকে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন, সাংগঠনিক যোগ্যতার প্রশ্নে রাজ্জাকই তার যোগ্য উত্তরসূরি। '৭৫-'৮০ সালে আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি আওয়ামী লীগের রাজনীতি বলতে আবদুর রাজ্জাকই ছিলেন কেন্দ্রবিন্দু। কেননা সারাদেশের লাখ লাখ সাধারণ নেতাকর্মীর আসল ঠিকানাই ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। '৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর ১৫-২০ দিনের মধ্যে আমরা কয়েকজন কর্মী রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে সেখানে যোগাযোগ করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল_ একটা বৈঠকে বসে প্রতিরোধ সংগ্রামের দিকনির্দেশনা নেয়া। মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের একটা বাসায় গোপন বৈঠক করে তাকে বিদায় দেয়ার তৃতীয় দিনেই জানতে পেরেছিলাম রাজ্জাক ভাই গ্রেফতার হয়ে গেছেন। '৭৮ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়েই তিনি হাল ধরেন আওয়ামী লীগের। তখনই দেখা গেছে কি আবেগপ্রবণভাবে গোটা দেশের নেতাকর্মীরা তার দিকে ছুটছে। জোহরা তাজউদ্দীন ও আবদুল মালেক উকিলকে সামনে রেখে তিনিই মূলত একক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে আবার তার ঐতিহ্যের আসনে সমাসীন করেছিলেন। দল পুনর্গঠনের সেই ইতিহাস কখনই মলিন হবে না।
বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল, যা মহিউদ্দিন আহম্মদ ও আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল তা ছিল মূলত একটি ভুল সিদ্ধানত্ম। কিন্তু বাকশালের রাজনৈতিক লৰ্য, আদর্শ ও নীতি ভুল ছিল না। এখনও তার প্রাসঙ্গিকতা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। কারণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নির্যাস হয়েই তার জীবনের শেষে ৬-৭ বছরে তা জাতির সামনে বাকশাল কর্মসূচী হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল? অপ্রিয় ও তিক্ত অভিজ্ঞতার পরে এবং কঠিন বাসত্মবতার আলোকে যখন রাজ্জাক ভাই বাকশাল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে আবার আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন করলেন তখন কয়েক সাৰীর উপস্থিতিতে যাদের কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন, দলের সভানেত্রী কথা দিয়েছিলেন আগামী কাউন্সিলে রাজ্জাক ভাইকেই দলের সাধারণ সম্পাদক করা হবে। কারণ, তিনি এখনও আওয়ামী লীগে অত্যনত্ম জনপ্রিয়। কিন্তু শেষ পর্যনত্ম সেই কথা রাখা হয়নি। সেই থেকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম বা উপদেষ্টাম-লীর নেতা থাকলে ও সাংগঠনিক যোগ্যতা প্রদর্শনের আর সুযোগ পাননি বা সুযোগ দেয়া হয়নি। কারণ মন্ত্রিত্বে থেকেও দলকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করানোই ছিল মূল ব্রত। দল যথার্থ শক্তিশালী না হলে যে সঠিকভাবে সরকার পরিচালনা এবং প্রতিপৰ রাজনৈতিক শক্তিকে কাবু করা সম্ভব হয় না, এই সত্য তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তিনি এও বিশ্বাস করতেন, দলের সর্বসত্মরের কর্মীদের যথাযথ প্রশিৰণ দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। প্রশিৰিত রাজনৈতিক কর্মীর শক্তি যে কোন তুলনায়ই বিশাল। যে কারণে তিনি যখনই দলের দায়িত্ব পালন করেছেন তখনই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিৰণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাই বলছিলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পরে আবদুর রাজ্জাকই ছিলেন একমাত্র সাংগঠনিক যোগ্যতার অধিকারী নেতা। যার তুলনা ছিলেন তিনি নিজেই। কিন্তু '৮০-পরবর্তী সময়ে দল তার সেই অসীম যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক আজ আর নেই। ইতিহাসের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হয়েছে। এই চরম সত্য মেনে নিতে আমাদের অনেকের কষ্ট হলেও এটাই বাসত্মবতা। দল হয়ত তাকে তেমন মূল্যায়নে ব্রতী হবে না। সেই রেওয়াজ ও দূরদর্শিতা নেই বললেই চলে। তবে দেশে আগামী দিনে যাঁরাই প্রকৃত রাজনীতির ইতিহাস অনুসন্ধানে গবেষণা করবেন, যাঁরা আওয়ামী লীগের উত্থান-গতিবিধি নিয়ে কাজ করবেন এবং যারা প্রকৃত রাজনীতির নীতি-আদর্শ সমুন্নত করতে এগিয়ে আসবেন তাঁরাই ইতিহাসের একটা পর্বে দেখতে পাবেন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় এক আবদুর রাজ্জাককে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের নেতা আবদুর রাজ্জাক আর নেই। লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)।
আবদুর রাজ্জাককে তিন দিন ধরে ওই হাসপাতালে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র লাগিয়ে রাখা হয়েছিল। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত নয়টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে রাত নয়টা ১০ মিনিটে তাঁর কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে ফেলা হয়।
আবদুর রাজ্জাকের যকৃৎ (লিভার) ও বৃক্ক (কিডনি) অকেজো হয়ে পড়েছিল। তিন মাস ধরে তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে তিনি এক মাস ছিলেন লন্ডন ব্রিজ হাসপাতালে এবং দুই মাস কিংস কলেজ হাসপাতালে। তাঁকে যকৃৎ ও বৃক্ক দান করার জন্য দুজন দাতা লন্ডনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় অস্ত্রোপচারের মতো অবস্থা ছিল না, তাই যকৃৎ ও বৃক্ক প্রতিস্থাপন করা যায়নি। কয়েক বছর আগেও তাঁর একবার যকৃৎ প্রতিস্থাপন করা হয়।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আবদুর রাজ্জাকের বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি দুই ছেলে ফাহিম রাজ্জাক ও নাহিন রাজ্জাক, স্ত্রী ফরিদা রাজ্জাকসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। কাল রোববার বেলা ১১টায় তাঁর লাশ বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আবদুর রাজ্জাক শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলার দক্ষিণ ডামুড্যা গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৪২ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ইমামউদ্দিন এবং মায়ের নাম বেগম আকফাতুন্নেছা।
আবদুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হয়ে পড়েন। পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুম ভোগ করেন। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৬০-৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ’৬২-৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।
আবদুর রাজ্জাক ১৯৬৬-৬৭ ও ’৬৭-৬৮ দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাকশাল গঠিত হলে তিনি তখন অন্যতম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে দুই মেয়াদে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে তিনি বাকশাল গঠন করেন। ১৯৯২ সালে বাকশাল আওয়ামী লীগের সঙ্গে একীভূত হলে তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন।
আবদুর রাজ্জাক ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে দুটি আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পানিসম্পদমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যানারে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে গণ-আন্দোলন শুরু হয়, সেই আন্দোলনে আবদুর রাজ্জাক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
পাকিস্তান আমলে ছয় দফা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আবদুর রাজ্জাক। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে আবদুর রাজ্জাক ভারতের মেঘালয়ে মুজিব বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।
১৯৫৮ সালে আবদুর রাজ্জাক ডামুড্যা মুসলিম উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও পরে মাস্টার্স করেন। এরপর তিনি এলএলবি পাস করেন।