'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'
এইদেশ সংগ্রহ , সোমবার, ডিসেম্বর ২৪, ২০১২



১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই সেতারশিল্পী। বিটলস ব্যান্ডের সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে সঙ্গে নিয়ে রবিশঙ্কর আয়োজন করেছিলেন সাড়া জাগানো 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'।জীবদ্দশায় বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এই মহান শিল্পী। ১৯৯৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'ভারতরত্ন' দেওয়া হয় তাঁকে। চারটিটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন এই কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ।
সেতার বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি অনেক আগে থেকেই আগ্রহ ছিল জর্জ হ্যারিসনের। যেহেতু গিটার বাজাতেন, সেই ঢঙেই তিনি সেতার বাজানোর চেষ্টা করেছেন 'নরওয়েজিয়ান উড' গানটিতে। কিন্তু তিনি জানতেন, আসল সেতার বাজনা থেকে তিনি তখনো অনেক দূরে। তাই তিনি রবি শঙ্করের কাছে সেতার শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একেবারে সামনে থেকে রবি শঙ্করের সেতার বাদন জর্জ দেখেন ১৯৬৫ সালে জা জা হ্যাবরের বাড়িতে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। সেখানেই তিনি রবি শঙ্করের কাছে সেতার শেখার কথা বলেন। এমনকি এই সেতার শেখার জন্যই বিটলস ভারত সফরে এসেছিল। জর্জের সেতারের হাতেখড়ি তাঁর ইংল্যান্ডের বাড়িতে। সেখানে কয়েক সপ্তাহ ছিলেন রবি শঙ্কর। পরে কাশ্মীরে এক হাউসবোটেও চলে সেতার শেখার ক্লাস, যা শেষ হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ায়। শুধু সেতার শেখাই নয়, রবি শঙ্করের সাহচর্যে এসে নিজের লাইফস্টাইলই বদলে ফেলেছিলেন জর্জ হ্যারিসন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সাহায্যার্থে আয়োজিত 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এ পণ্ডিত রবি শঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসনের ভূমিকাও স্মরণীয় হয়ে থাকবে আজীবন।


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অকৃত্রিম বন্ধু ও উপমহাদেশের সুরসম্রাট পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর নেই। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানডিয়াগো শহরের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। বুধবার 'দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া'র অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মৃত্যুকালে রবিশঙ্করের বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। সেতার-সুরের এই মহান স্রষ্টা গত এক সপ্তাহ চিকিত্সাধীন ছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের জটিলতা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।

১৯২০ সালে ভারতের বেনারসে জন্মেছিলেন রবীন্দ্র শঙ্কর চৌধুরী; যিনি 'রবিশঙ্কর' নামেই বিশ্বে সুপরিচিত। শৈশবে ভাই উদয় শঙ্করের নাচের দলে কাজ করেছেন। ১৯৩৮ সালে নাচ ছেড়ে দিয়ে সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে সেতার শেখা শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে সংগীতপরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া রেডিওর সংগীতপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সত্যজিত্ রায়ের 'পথের পাঁচালী' (১৯৫৫), 'অপরাজিত' (১৯৫৬) এবং 'অপুর সংসার' (১৯৫৯) ছবির গীতপরিচালনা করে ব্যাপক প্রশংসিত হন রবিশঙ্কর।

১৯৫৬ সাল থেকে বেশ কটি সফরের মাধ্যমে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এই গুণী শিল্পী। ষাটের দশকে তিনি কয়েকটি দেশে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব কাজ করতে গিয়ে বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন ও প্রখ্যাত মার্কিন বেহালাবাদক মেনুহিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেন।

"রবিই প্রথমজন যিনি আমাকে মুগ্ধ করার কোনও চেষ্টাই করেননি বরং আমিই ওনাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম"।


মার্টিন স্কোর্সের তথ্যচিত্র জর্জ হ্যারিসন: `লিভিং ইন দ্য মেটিরিাল ওয়ার্ল্ডে` রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কথা এভাবেই জানিয়েছেন বিটলস সম্রাট জর্জ হ্যারিসন।

প্রথম সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাত শুধুমাত্র দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বেই পরিণত হয়নি, রবিশঙ্করের মাধ্যমেই হ্যারিসন পরিচিত হন ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে। যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনে অনেক পরিবর্তন এনছিল। "রবির সঙ্গে জর্জের সাক্ষাত শুধু দু`জন পৃথক মানুষের সাক্ষাত ছিল না, দুটো পৃথক সংস্কৃতির সাক্ষাত ঘটেছিল সেদিন"।গতবছর স্কোর্সের তথ্যচিত্র প্রদশর্নীর সময় বলেছিলেন জর্জের স্ত্রী অলিভিয়া হ্যারিসন। সেই তথ্যচিত্রে কিছুটা অংশ জুড়েও স্থান পেয়েছিলেন রবিশঙ্কর।

১৯৬৬ সালে লন্ডনে প্রথম দেখা হয় দুই মহীরুহর। রবিশঙ্করের সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ জর্জ ভারতে এসেছিলেন শুধুমাত্র তাঁর কাছে সেতার শিখবেন বলেই। রবিশঙ্কর শুধু তাঁকে সেতারই শেখাননি তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনকেও প্রভাবিত করেছিলেন। জর্জের সঙ্গে রবিশঙ্করের যোগাযোগ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর জনপ্রিয়তাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। বিশ্বের দরবারে ভারতীয় সঙ্গীতকে উচ্চাসনে বসিয়ে দেয়। ১৯৬৭ সালে মনটেরে পপ ফেস্টিভ্যালে টানা ৪ ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন রবিশঙ্কর। ১৯৬৯ সালে উডস্টক ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন করেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাজান কনসার্ট ফর বাংলাদেশে।

জর্জ হ্যারিসেনর প্রচুর গানেই পাওয়া গেছে ভারতীয় সঙ্গীতের ছোঁয়া। বিটলসের ৩টি অ্যালবামে সেতারের ব্যবহার করেছিলেন জর্জ। `রাবার সোল`, `রিভলভার` ও `লোনলি হার্টস ক্লাব ব্যান্ড` ৩ টি অ্যালবামে পাওয়া যায় সেতারের মূর্ছনা।


পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর নেই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই কিংবদন্তির মৃত্যুর খবর বাংলাদেশের এসে পৌঁছার পর পুরো সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন, শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, স্মৃতিচারণা করেছেন। তার মধ্য থেকে কিছু দেওয়া হলো এই প্রতিবেদনে।