অসমাপ্ত ভালবাসা
টুম্পা , মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১২


ক্লাস ৯ এ উঠার পর প্রথম দিন ক্লাস করতে গিয়ে নিজেদের থেকে বয়সে কিছুটা বড় একটা ছেলে কে ক্লাসে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যাই। বান্ধবীদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি তিনি আমাদের তিন বছরের সিনিয়র। টেষ্ট পরীক্ষা দেয়ার পর পারিবারিক একটা সমস্যার কারনে তিনি এস এস সি পরীক্ষা দেন নি। এখন আবার আমাদের সাথে ভর্তি হয়েছেন।
ছেলেটি কে প্রথম বার দেখেই মনের ভেতর কেমন যেন একটা অন্য রকম অনুভুতি হল যা আগে কখনও হয় নি। ছেলেটি দেখতে অতটা সুন্দর নয় তবে কেন জানি না আমার খুব ভাল লাগত। সে খুবই ব
ুদ্ধিমান ছিল। শামলা গায়ের বর্ণ।
ধীরে ধীরে ক্লাস চলতে থাকে আর তার প্রতি আমার আকর্ষণ বাড়তে থাকে। বান্ধবীদের কাছে শুনতে পাই সে ছেলে হিসেবে তেমন একটা ভাল নয়। অনেক মেয়ের সাথেই সম্পর্ক। এসব শুনে কিছুটা মনক্ষুন্ন হলেও তার প্রতি আমার ভাল লাগাটা মোটেও কমেনি। তার নামটি ছিল…………। থাক নাই বা বললাম তার নামটি। আমি তার একটা নাম দেই আবির।
আবির সবসময় ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসত। আমাদের ক্লাসে বেঞ্চ গুলো U আকারে সজ্জিত ছিল। আমি ফার্স্ট গার্ল ছিলাম বলে আমার বেঞ্চ টা আগে থেকেই নির্দিষ্ট ছিল। সে ও ঠিক আমার সম্মুখের বেঞ্চটিতে বসত। কেন বসত তা আমি জানতাম না। হয়ত বা আজও জানি না।
সে ক্লাসে সবসময় বন্ধুদের সাথে দুষ্টমি করলে বা স্যারদের সাথে কোন হাসির ঘটনা ঘটলে আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসত। কেন আমার দিকে তাকিয়ে হাসত তা আমি জানতাম না। হয়তবা আজও জানি না।
একদিন দেখি তার বাম হাতে একটি সাদা কাপড় মোড়ানো। ব্যান্ডেজ করা হাতটি। কি হল সেটা জানার জন্য নানা বাহানায় কিছু বান্ধবীর কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি তার হাতে নাকি আমার নামের প্রথম অক্ষর লেখা। আমি কথাটা বিশ্বাস করতে পারলাম না। বার বার তাদের জিজ্ঞাসা করলাম কিন্তু তারা একই উত্তর দিল। বলল আবির নাকি ব্লেড দিয়ে কেটে নিজের হাতে আমার নামের প্রথম অক্ষর লিখেছে। শুনে আমার কেন যেন খুবই ভাল লাগল। কিন্তু বান্ধবীদের সাথে অনেক রাগারাগি করলাম। বললাম এসব আজেবাজে কথা যেন আমার সামনে আর কখনও না বলে। বাড়ি এসে এ ব্যাপার টা কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারলাম না। ভাবতে লাগলাম কথাটা কি আসলেই সত্যি। আসলেই কি সে আমার নাম টা তার হাতে লিখেছিল? সে কথাটা আমি জানতাম না। হয়তবা আজও জানি না।
দোকান থেকে একটা ব্লেড কিনে এনে সোজা পুকুর পাড়ে চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে ব্লেড টা দিয়ে অনেক ক্ষন চেষ্টা করলাম নিজের বাম হাতে তার নামের প্রথম অক্ষর টি লেখার। আমি খুবই ভীতু মেয়ে। নিজের হাত কেটে কিছু লেখার মত সাহস আমার ছিল না। অনেক্ষন চেষ্টা করে দুই একটি আছড় শুধু কাটতে পারলাম। সামান্য কিছু রক্ত এল। এ কাজ টা আমার দ্বারা হবে না সেটা বুঝতে পেরে ফিরে গেলাম।
আবার চলতে লাগল আবিরের দিকে তাকিয়ে হাসা ওর হাসি উপভোগ করা। নিজের মনের কথা ওকে বলতে চাওয়ার ইচ্ছা। হয়তবা অপেক্ষায় ছিলাম ও আচমকা আমার পথ আগলে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলবে তোমায় ভালবাসি। কিন্তু না সে বলল না। আমি অপেক্ষায় রইলাম বলবে সে কোন এক সময়।
বলেনি তাও হয়ত বা ভালই হয়েছে। করন সে আমাকে প্রপোজ করলে যে রিজেক্টেড হত সেটা নিশ্চিত। আমার এতটুকু জীবনে আমি কম প্রপোজ পাইনি। অনেক ভাল ও সুন্দর ছেলে আমায় প্রপোজ করেছে। কিন্তু ভালবাসাটা একটা খারাপ ও লজ্জাকর কাজ সেটা ভেবে আমি সবসময় এটা থেকে দূরে থাকতাম। ক্লাসে কখনই ছেলেদের সাথে কথা বলতাম না। অনেক ছেলেই তাদের মনের কথা বলার জন্য পথ আটকে ছিল। এক্সেপ্ট বা রিজেক্ট তো হচ্ছে পরের কথা। আমি তাদের কথা পর্যন্ত শুনি নি।
ক্লাসের সব ছেলেরাই আমাকে ভয় পেত। কারন আমি ছিলাম হেডমাস্টারের খুব আদরের। কেউ কিছু বললেই সাথে সাথে স্যারের কাছে বিচার দিতাম। আর স্যার ছিল খুব কড়া। কেউ কোন অন্যায় করলে একমাত্র শাস্তি হচ্ছে বা হাতে চুল ধরে ডান হাতে দুগালে ৪-৫ টি চড় বসানো। তার এই শাস্তি টা ছেলেদের জন্নই ছিল। স্যার কখনও মেয়েদের চড় দিতেন না। স্যারের সেই চড়ের ভয়ে কেউ সাহস করে আমার সাথে কথা বলতে আসত না। হয়ত বা সেই চড়ের ভয়ে সেও আমায় বলেনি তোমায় ভালবাসি। হয়তবা তার মনে আমি ছিলাম না। হয়তবা সে ভালবাসত অন্য কাউকে যে আমার থেকে সুন্দরী। হয়তবা তার দৃষ্টিতে আমি তার ভালবাসার পাত্রি ছিলাম না। হয়তবা অনেক কিছুই যা আমি জানি না। জানতাম না আর জানতে চাই না। এভাবেই কেটে যেতে লাগল মাসের পর মাস।
কথায় কথায় একদিন জানতে পারলাম সে অন্য কাউকে ভালবাসে। যে ক্লাস এইটে পড়ে। সেটা শুনে আমি কষ্ট পেলাম কিন্তু জানিনা। তবে সে মেয়েটার সাথে নিজের তুলনা করতে লাগলাম। কিন্তু তুলনা করতে গিয়ে দেখলাম সে আমার সাথে তুলনার যোগ্যও না। নিজের অজানা অপূর্ণতা নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
আমার বান্ধবীদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তবা আমার মনের কথা আঁচ করতে পেরেছিল কিন্তু তারা প্রকাশ্যে জিজ্ঞাসা করার মত সাহস করতে পারিনি।
আমার বেঞ্চে কে যেন আমার আর ওর নাম লিখে রাখত। আমাদের নামের অক্ষর প্লাস দিয়ে লিখে রাখত। কে বা কারা লিখত কেন লিখত তা আমি জানতাম না। হয়তবা এখনও জানি না।
এভাবে কাটতে থাকে সময়।
লোকের মুখে শুনতাম সে আমায় ভালবাসে। কিন্তু তার মুখে কখনও শুনলাম না। এ আমার জীবনের অনেক বড় একটা না পাওয়া। তাকে কখনো নিজের এই অবুঝ মনের প্রথম ভালবাসার কথা বলতে পারলাম না। এ আমার জিবনের অনেক বড় ব্যর্থতা।
রমযান মাসের ছুটি পড়ে গেল। একেবারে ঈদের পর স্কুল খুলবে। সবসময়ের মত এবারও খুশি। কারন একটা লম্বা ছুটি পেয়েছি। ঈদের ৪-৫ দিন আগে হঠাৎ করে একদিন আমার একটা বান্ধবী আমার হাতে একটা ঈদ কার্ড এনে দিল। এবং বলল এটা আবির দিয়েছে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বিশ্বাস করতে পারলামনা নিজের চোখ দুটোকে। গায়ে চিমটি কেটে দেখি না এটা সত্যি। তাড়াতাড়ি কার্ড টি নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলাম। চুপিচুপি কার্ডটি খুললাম অনেক কিছু পাবার আসায়। একরাশ আশা এই বুকে বেধে নিজের কল্পনার সেই কথা গুলো পড়ব আজ সেটা ভেবে খুললাম কার্ডটি। দেখি কতগুলো ছন্দ লেখা। ভালবাসার আবেগে লেখা সেই ছন্দ গুলো। চারপাশে ছন্দ আর মাঝখানে ইংরেজিতে লেখা একটি কথা।
লেখাটি ছিল
“I want you as my companion in life. I will be the happiest person in the world if you looks my way I really need you.”
এই লেখাটি পড়ে আমার মনের ভেতর নাড়া দিয়ে উঠল। আমার কেন যেন খুবি ভাল লাগল এটা ভেবে যে আমি যাকে ভালবেসেছি সেও আমায় ভালবাসে। এবার এ ভালবাসা সফল হক আর না হক তাতে আমার কিছুই আসে যায় না।
অনেক স্বপ্ন অনেক আশা নিয়ে ঈদের পর স্কুল খোলার দিন স্কুলে উপস্থিত হলাম। ভাবলাম হয়তবা তাকে আমি কিছুই বলবনা কিন্তু আশায় আছি সে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু একি সে কিছুই জানতে চাইল না। ক্লাসের অন্য একটা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম আমাকে কার্ডটা কে দিয়েছিল? সে বলতে চাইল না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সেটা আবির কি না? কিন্তু সে বলল এ কার্ডটা আবির দেয় নি। দিয়েছে অন্য একটা ছেলে যে আমাকে অনেকদিন ধরেই ভালবাসে কিন্তু বলতে পারছে না। আনেক সাহস করে আমায় কার্ড টা দিয়েছে কিন্তু নিজেকে গোপন রেখেছে। যদি আমি তার প্রস্তাবে রাজি থাকি তাহলে সে আমায় তার পরিচয় দিবে। কিন্তু আমি তার পরিচয় জানতে অস্বীকৃতি জানাই। পরিচয় জেনেই বা কি হবে? আমি যাকে চেয়েছিলাম এ তো সে নয়। একে তো আমি চাইনি। মনটা ভেঙ্গে গেল। অনেক অনেক অনেক বেশি কষ্ট পেলাম। কিন্তু কাউকে কিছু বলিনি। আর যে কার্ড টি দিয়েছিল তার পরিচয় জানতে চাইনি। আমি আজ জানি না সে কে?
কিছুদিন পরেই আমার একটা বিয়ে আসে। বাবা-মা এতে রাজি। আমার দিকে চেয়ে আছে আমি কি বলি। মন তো আমার আগেই ভেঙ্গে গেছে। কিছুই বললাম না। সম্মতি অসম্মতি কিছুই না। বিয়ে হয়ে গেল।
আজ আমি একটা সন্তানের মা। আমার স্বামীকে আমি খুব ভালবাসি। খুব সুখের সংসার আমার। কিন্তু তারপরে ও মনের এক কোনায় সে না পাওয়া আজও জেগে আছে। আজও তা আমাকে কাদায়। আজও যখন একলা থাকি যখন খুব বৃষ্টি পরে তখন তার কথা আমাএর অনেক বেশি মনে পরে। অনেক অনেক অনেক বেশি।
মনের ভেতর একটা আফসোস রয়ে গেল আদৌ সে জানে কি এ অভাগিনী তাকে কোন এক সময় এতটা ভালবেসেছিল।
সে কি জানে তাকে নিয়ে আমি আজও ভাবি।
সে জানে কি তার জন্য এ মন আমার আজও কাদে।
আজও এ দুটো চোখ তাকে এক পলক দেখার জন্য খোঁজে।
সে কি আমায় এতটুকু ও ভালবাসত।
এই কি অসমাপ্ত ভালবাসা।