এবার বিদেশে বিএনপি নেতাদের অর্থের অনুসন্ধানে সরকার
মাসুম আহম্মেদ , মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১২




এবার বিএনপি নেতাদের বিদেশে অবৈধ অর্থের অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকার গঠনের চার বছর পর এ ধরনের তৎপরতায় বিএনপি নেতারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, আমরা যখন আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশ-বিদেশে অবৈধ সম্পদের খোঁজখবর নিচ্ছি তখনই এ ধরনের তৎপরতা বিস্ময়কর।

জানা যায়, ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে তৎপর হয়েছে দুদক। তাতে প্রভাবশালী ৬০ ব্যক্তির প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিরোধী দলীয় নেতা। এ ছাড়াও আছেন ব্যবসায়ী, আমলা ও অন্য পেশার ব্যক্তিরা।

তবে সরকারি সূত্রগুলো বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছে, বিরোধীদলীয় ১৩ নেতার টাকা বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যেক নেতার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অর্থের অভিযোগ তুলে বিদেশে জোর লবিং চালানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, জাপান ও কানাডায় বাংলাদেশের এবার মিশনগুলোকে এ বিষয়ে বিশেষ তৎপরতার সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে। বিভিন্ন দেশের কাছে অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে ১৮টি এমএলআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং রিকোয়েস্ট) পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। সূত্র জানায়, অর্থ পাচার সংক্রান্ত প্রায় ৪৫টি মামলার অনুসন্ধান পর্ব শেষ করেছে দুদক। আরও ১৫টি মামলার অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যাদের টাকা বিদেশে রয়েছে সন্দেহ করে প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তার স্ত্রী ও ছেলে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খান ও তার ছেলে, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী ব্যারিস্টার সিগমা হুদা, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহিম, জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী। আরও আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর নাম। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করে বিদেশে খোঁজখবর করা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এসব টাকা উদ্ধারে ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ, বিচার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। এ ছাড়াও কিছু দিন ধরে চলতে থাকা অনুসন্ধানে গতি আনতে চিঠি দেওয়া হয়েছে বিদেশি মিশনগুলোকে। মিশনগুলোকে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে সহায়তা দিতে মিশন প্রধানকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষগুলোর সঙ্গে দ্রুত আলোচনার প্রক্রিয়া চালানোর অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া হিসেবে দেশের আদালতে অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণের প্রক্রিয়া চলছে। আইনি মারপ্যাঁচ ও মামলা জটের কারণে বিলম্ব হলেও দুদকের পক্ষ থেকে বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ১৮টি এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আইনগত জটিলতা শেষ করে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হবে। তাই নির্দিষ্ট করে অর্থ ফেরত আনার দিন-ক্ষণ বলা যাচ্ছে না। তবে কোকোর টাকা দ্রুতই যেহেতু ফেরত এসেছে, তাই অন্যদের বিষয়েও আমরা আশাবাদী। সিঙ্গাপুর থেকে আরও নয় লাখ ৩২ হাজার মার্কিন ডলার আসার অপেক্ষায় রয়েছে। তবে কবে নাগাদ এ অর্থ আসতে পারে তার দিন-ক্ষণ বলা কঠিন। তবে দুদকের এ ধরনের তৎপরতাকে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, নিজেদের সীমাহীন দুর্নীতি আর ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য এবং বিরোধী দলের নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই সরকার এ ধরনের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করছে। কিন্তু এসব করে কোনো লাভ হবে না। কারণ 'ওয়ান-ইলেভেন'র খলিফারাও বহু চেষ্টা করেছে, আমাদের জেল পর্যন্ত খাটিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই পায়নি। তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও মানি লন্ডারিং থেকে শুরু করে অনেক মামলা দিয়েছে। অনেক অপপ্রচার চালিয়েছে। কিন্তু বিদেশে তার নামে টাকা তো দূরের কথা একটি অ্যাকাউন্টও খুঁজে পায়নি এ সরকার। কাজেই এসব না করে সরকারের উচিত জনগণের দাবি মেনে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, ২০১০ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে। এ ছাড়াও শেয়ারবাজার লুটপাট, কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট, হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার এখন প্রমাণিত সত্য। কারণ সব ঘটনায় সরকারিভাবেই তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে, সেখানে সরকার সংশ্লিষ্টদের নামই এসেছে। এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সব ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনাকে আড়াল করতে এবং জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্যই সরকার এসব অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।