‘এ্যা জার্নি টু মেলাঘর’
লায়লা আফরোজ , শুক্রবার, জানুয়ারি ০৪, ২০১৩



আজ ১০ই জানুয়ারী, খুব মনে পড়ছে ২০০১ সালের এই দিনটির কথা! যে দিন
ত্রিপুরা রাজ্য-সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ থেকে ১১০ সদস্যের একটি
প্রতিনিধি দল ত্রিপুরা গিয়েছিল ‘প্রথম মুক্তিযুদ্ধ উৎসবে’ যোগ দিতে। সেই
দলে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী আসম আব্দুর রব, প্রয়াত মেজর
জেনারেল(অঃ) মীর শওকত আলী (বীর বিক্রম), রাশেদ খান মেনন, কামাল লোহানী,
সৈয়দ হাসান ঈমাম, কবি আসাদ চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, হাবিবুল আলাম (বীর
বিক্রম), নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু (বীর প্রতীক), মেজর(অঃ) কামরুল ইসলাম
ভূঁইয়া, মেজর(অঃ) আখতার, গণ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডঃ জাফরুল্লাহ্‌,
সাংবাদিক হারুণ হাবীব, মেসবাহ কামাল, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের
শব্দ সৈনিক ফকির আলমগীর, তপন মাহ্‌মূদ, প্রয়াত কবি সমূদ্র গুপ্ত, রওশন
আপা (মিসেস কাজী আরেফ আহ্‌মেদ),ফকির শাহাবুদ্দীনসহ অসংখ্য বীর
মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আবৃত্তিকার হিসেবে
প্রতিনিধি দলে ডাক পড়েছিল হাসান আরিফ, আহকাম উল্লাহ এবং আমার।
নানা কারণে সেই জমজমাট মুক্তিযুদ্ধ উৎসবটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের রয়েছে এক অবিস্মরণীয় অবদান। একদিকে,
তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্যারিশমাটিক লিডারশীপ
বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব-জনমত সৃষ্টি করে আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত
করেছিল, অন্যদিকে ভারত ১ কোটি বাংলাদেশী উদ্বাস্তুকে ৯ মাস খাদ্য, ওষুধ ও
আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল, যা আজ ইতিহাস। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের
ত্রিপুরা রাজ্যেরও রয়েছে এক বিশাল ভূমিকা । আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য
ত্রিপুরাবাসীর রয়েছে সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাই, ত্রিপুরাবাসীর কাছে আমাদের
ঋণের সীমা নেই।
এক চরম টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কমলাপুর রেল ষ্টেশন থেকে ছাড়া
রিজার্ভ ট্রেন ‘জৈন্তা-এক্সপ্রেস’ কুমিল্লার লাকসাম হয়ে যখন বিকাল
পাঁচটায় আখাউড়া রেল ষ্টেশনে পৌঁছায় তখন শীতের সূর্য পাটে যেতে বসেছে।
অপেক্ষমাণ একাধিক বাস ও মাইক্রোবাস আমাদের নিয়ে ছুটে চলেছে সীমান্তের
দিকে, দু’পাশের দিগন্ত-বিস্তৃত সোনালী পাকা ধানের মাঠকে পেছনে ফেলে । এমন
দৃশ্য দেখলেই কেবল মনে পড়ে কবি দারা মাহ্‌মুদের ‘দিন আসে’ কবিতার কথা-

“মৌসুমি ধানে সবুজ হয়েছে মাঠ, কৃষক শিশুরা সূর্যের মত হাসে,
গত বসন্তে যুদ্ধে গিয়েছে যারা, তারা কি ফিরেছে ফসলের আশ্বাসে,
লোক-চরাচরে মানুষের দিন আসে, লোক-চরাচরে মানুষের দিন আসে”!!

কাস্টমস্‌ এবং ইমিগ্রেশন ফর্ম্যালিটিস সেরে ‘নোম্যান্স্‌ ল্যাণ্ড’
পেরুতেই দেখি ওপারে বিশাল রিসেপ্‌শান প্যান্ডেল, যেখানে অসংখ্য মানুষ,
সরকারি প্রোটোকল, সকাল থেকেই আমাদের জন্য অপেক্ষমান। ফুল, ব্রিটানীয়া
বিস্কুট আর মিনারেল ওয়াটার-যোগে আপ্যায়িত হয়ে আবেগ-আপ্লুত কবি আসাদ
চৌধুরী তো নজরুলের গান ‘ফুল নেবে না অশ্রু নেবের’ আদলে প্যারডী বানিয়ে
ফেললেন-‘ফুল নেবে না, ব্রিটানিয়া ফিফ্‌টি ফিফ্‌টি’?

বর্ডার থেকে শহরের দূরত্ব মাত্র বিশ মিনিটের! হোটেলে পৌঁছেই দেখি ডাইনে-বাঁয়ে চারিদিকে রাইফেল হাতে প্রহরারত ভারতীয় সেনাবাহিনী, যাকে বলে এক্কেবারে নিশ্ছিদ্র প্রহরা! ‘উল্‌ফা-আক্রমণ’ তখন তুঙ্গে, তাই এই কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় ত্রিপুরার তৎকালীন গভর্নর, মূখ্যমন্ত্রী শ্রী মানিক সরকার, কবি ও শিক্ষামন্ত্রী শ্রী অনিল সরকারসহ ত্রিপুরার সর্বস্তরের মানুষের চারদিনের সেই উষ্ণ আতিথেয়তার কথা কোনোদিন
ভুলব না!

সৌভাগ্যবশত, আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল প্রয়াত মেজর জেনারেল(অবঃ) মীর শওকত এবং বাচ্চু ভাইদের সাথে একই হোটেলের পাশাপাশি কামরায়। আমরা তো মহা-খুশি! প্রতিদিন অনুষ্ঠান শেষে রাতে হোটেলে ফিরেই সে কী তুমুল আড্ডা! সে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা! হাবিবুল আলম ভাই, বাচ্চু ভাই সবাই ফিরে গিয়েছিলেন তাঁদের একাত্তুরের দিনগুলোতে, তাঁদের কুড়ি-একুশ বছর বয়সে। কতো কতো স্মৃতি, গল্পে গল্পে রাত ভোর, তবু যেন শেষ হতে চায় না সেই দুর্ধর্ষ দিনের স্মৃতি-রোমন্থন!

এক রাতে একটা হোটেল খুঁজতে গিয়েছিলাম আমরা, যেখানে বাচ্চু ভাইরা যুদ্ধের ফাঁকে প্রোটিন(মাংস) খেতে আসতেন। ত্রিপুরা পোস্ট-অফিসের সামনে পৌঁছেই হাবিবুল আলম ভাই আর বাচ্চু ভাই আমাদের দুই মহান বীর আনন্দে মাইক্রোবাস থেকে যেভাবে লাফিয়ে নেমে ছিলেন, সে লাফ ছিল সত্যি দর্শনীয়! এঁদের এই বালক-সুলভ আচরণ আমি খুব উপভোগ করি। আজো এঁদের মধ্যে এই মনটা আছে বলেই বোধহয় তাঁরা স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও এতো সবুজ, এতো প্রাণবন্ত এবং এতো স্বাপ্নীক রয়ে গেছেন!

সেই প্রথম, ত্রিপুরা গভর্ণমেণ্ট ফর্ম্যালি বাংলাদেশের কাছে ‘ট্রান্‌জিটের’ আবেদন জানিয়ে ছিল। শ্রী অনিল সরকার বলেন-ত্রিপুরা থেকে কলকাতায় যেতে দুই থেকে আড়াই দিন লাগে। ফলে, একজন মূমুর্ষু রোগীকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাবার সময় পথেই সে রোগী মারা যায়। ঢাকা দিয়ে ‘ট্রান্‌জিট’ পেলে জার্নিটা কমে আসে এক থেকে দেড় দিনে, উপকৃত হয় ত্রিপুরাবাসী। মানবিক আবেদন নিঃসন্দেহে, কিন্তু অতীতে আমাদের তার চেয়েও বড়ো বড়ো মানবিক আবেদনে সাড়া দেয় নি ভারত। তিস্তার পানির সম-বণ্টনের জন্য আমরা হাহাকার করে মরেছি, আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে নালা হয়ে গেছে, আমাদের সমগ্র উত্তরবঙ্গ মরুভূমি হয়ে গেছে! কবি রফিক আজাদের ‘এ কেমন কাল এলো’ কবিতায় সেই ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা আছে-

‘প্রতিটি শস্যের মাঠ গ্রাস ক’রে আছে
অনুর্বর বালি; বিস্তারিত হচ্ছে ক্রমে মরুভূমি!
মৌসুমি বায়ুর আশীর্বাদ থেকে রিক্ত
এই শ্যাম শষ্পাঞ্চলে যেন আর তৃণগুল্ম নেই,
বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নেই দিগন্ত-বিস্তৃত গোচারণযোগ্য কোনো ভূমি।
‘সুজলা-সুফলা’ বলে ইতিহাস-খ্যাত এই বাঙলা
অন্তর্ভুক্ত হ’য়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে মরু এলাকায়’ !!

(কিন্তু হায়, কে শোনে কার কথা! এসব সমস্যার সমাধান, আদৌ কি কোনকালে হবে? ) উৎসবের শেষ দিন ছিল সাইট-সিইং, আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মেলাঘর অভিমুখে, যেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল একাত্তুরের দিনগুলোতে। দেখেছিলাম ত্রিপুরার জঙ্গলে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম হাসপাতালের ধ্বংসাবশেষ এবং কালের স্বাক্ষী সেই হাসপাতালের রাঁধুনীকে, যিনি তখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। এসেছিলাম সোনাইমুড়ি পর্যন্ত, যেখান থেকে ঢিল ছোঁড়ার দূরত্বে দাঁড়িয়ে
দেখেছি আমাদের ট্রেন যাচ্ছে ঢাকার দিকে যার গায়ে লেখা ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে’, আর তা দেখে সে কী উল্লাস সকলের! দীর্ঘ ১১ বছর পর, আজোও ভুলতে পারিনি সেই ভ্রমণের কথা, ভুলতে পারিনি দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত সেই প্রথম মুক্তিযুদ্ধ উৎসবের কথা। আমাদের অস্তিত্বের গভীর লোকালয়ে আজো অবিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে সেই ঐতিহাসিক ‘জার্নি টু মেলাঘর’! (পুরনো ডায়েরীর পাতা থেকে)।

লায়লা আফরোজ, আবৃত্তিকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।