‘দক্ষিণ এশিয়ায় বামপন্থি এবং ইসলামপন্থিরা সেই পুরনো ধারাতেই আটকে রয়েছে’ ।। অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ
সাক্ষাৎকার গ্রহনঃ শুভ কিবরিয়া, সহযোগিতায় সায়েম সাবু , বুধবার, জানুয়ারি ০৯, ২০১৩


অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ আমেরিকার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, পলিটিক্যাল ইসলাম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. রীয়াজ তার কাজের কারণে ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর-২০১২’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ ক্যারোলিনার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতালব্ধ ড. রীয়াজ আন্তর্জাতিক নানা গবেষণাসহ বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে লেখালেখির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। ‘পলিটিক্যাল ইসলাম অ্যান্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ (রাউটলেজ, ২০১০), ‘রিলিজিয়ন অ্যান্ড পলিটিক্স ইন সাউথ এশিয়া’ (রাউটলেজ, ২০১০), ‘ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাস ইন সাউথ এশিয়া’ (রজার্স ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৮), ‘ইসলামিস্ট মিলিটেন্সি ইন বাংলাদেশ : এ কমপ্লেক্স ওয়েব’ (রাউটলেজ, ২০০৮) তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। সম্প্রতি ঢাকায় সাপ্তাহিক-এর মুখোমুখি হয়ে কথা বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতা উঠে আসে আলোচনায়। আরব দুনিয়াজুড়ে ইসলামপন্থিদের উত্থান থেকে বাংলাদেশে বামপন্থিদের রাজনৈতিক প্রবণতার বিশ্লেষণ যেমন আছে সে কথোপকথনে, তেমনি বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মূল্যবান পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তিনি।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভ কিবরিয়া সহযোগিতায় সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : এবার দেশে আসার পর আপনি মিডিয়াতে বিশেষত টকশোগুলোতে বেশ সক্রিয়। দেশের বাইরে থাকলে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য থেকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ মেলে। দেশের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?
আলী রীয়াজ : দেশের বাইরে থেকে বড় পারসপেকটিভ (প্রেক্ষাপট) থেকে দেখার সুযোগ থাকে। নিত্যদিনের বিষয় তো আছেই। দেশের বাইরে থাকলেও আমি দেশের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোও জানার চেষ্টা করি। এখন ইন্টারনেটে দেশের অনেক পত্রিকা পাওয়া যায়। চ্যানেলগুলো থেকেও তথ্য পাওয়া যায়।
এবার দেশে এসে আমার কাছে দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, এক ধরনের অনিশ্চিয়তা, যা সবার মধ্যে লক্ষ্য করছি। আমি সাধারণ মানুষের দিক থেকে এই অনিশ্চিয়তার কথা বলছি। গাড়ি চালক, মিডিয়াকর্মী বা সাধারণ রাজনৈতিককর্মীদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। সবার মধ্যেই এক ধরনের উদ্বিগ্নতা রয়েছে যে, কী হবে? দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, মানুষ অস্থিরতার মধ্যে আছে। এই অস্থিরতা আমার কাছে উদ্বিগ্নতার চাইতে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, আপনি যখন অস্থির থাকবেন তখন আপনার কাছে বড় চিত্রটা দেখার কোনো সুযোগ থাকবে না। অস্থিরতার মধ্যে আপনাকে তাৎক্ষণিক বিষয়গুলোয় মনোযোগ দিতে হবে। অস্থিরতার কারণ হচ্ছে, ক্রমাগতভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের বিষয়গুলো। এই বিষয়গুলো কিন্তু বাইরে থেকে খুব একটা দেখতে পাবেন না।
আরও একটি বিষয় আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোর ভূমিকা। দেখবেন, গণমাধ্যমগুলোতে বিশেষ করে চ্যানেলগুলোয় যে টকশো, সংবাদ বা তথ্য পরিবেশন করা হয় তাতে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক বিষয়গুলোতেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। দেশের অবস্থা খারাপ এই কথা শুনতে শুনতে আপনার মধ্যেও এক ধরনের অস্থিরতা চলে আসবে।
এই অস্থিরতা এবং অনিশ্চিয়তা দুটি বিষয় যখন এক হয়ে যায় তখন জনমনে উদ্বিগ্নতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এখন তাই দেখতে পাচ্ছি।
সাপ্তাহিক : কিন্তু উত্তেজনা তো বড় উপাদান, সেটা রাজনীতির ক্ষেত্রেই বলি আর সামাজিক ক্ষেত্রেই বলি। এখানে যে যত এজিটেড করতে পারে, মানুষকে উত্তেজিত করে তার পক্ষে আনতে পারে সেই তো বড় নেতা।
আলী রীয়াজ : আমি রাজনীতিতে উত্তেজনার বিষয়টিকে আবেগ বলে মনে করি। সব দেশের রাজনীতিতেই আবেগের বিষয়টি লক্ষণীয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই আবেগকে আপনি কীভাবে ব্যবহার করছেন। রাজনীতিতে আবেগের ব্যবহার গঠনমূলকও হতে পারে আবার ধ্বংসাত্মকও হতে পারে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে বারাক ওবামা ২০০৮ সালে যখন প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তখন তিনি বললেন, দেশের অবস্থা খারাপ কিন্তু আমরা এটি বদলাতে পারি। আমরা পরিবর্তন চাই। কতটা তিনি বদলাতে পেরেছেন সেটা হয়ত অন্য বিতর্ক। কিন্তু তিনি এবারের নির্বাচনে বললেন, আমরা যতটুকু অর্জন করেছি সেখান থেকে আরও এগুতে চাই। এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় আবেগ থেকে সঞ্চয় করতে হয়। এটিই রাজনীতিতে আবেগের ব্যবহার। যদিও রিপাবলিকানরা বারাক ওবামার নীতি এবং শাসন আমলের ঘোর বিরোধিতা করে আসছেন।
সাপ্তাহিক : যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিতর্কের বিষয়টি লক্ষ্য করা গেলেও সেখানে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজমান। কিন্তু নির্বাচন হবে কি হবে না এমন প্রাথমিক বিষয়গুলো নিয়েই আমাদের এখানে দ্বন্দ্বের শেষ নেই। এই বিষয়টি কীভাবে দেখছেন।
আলী রীয়াজ : এই জায়গা থেকে বের হতে হবে। অনিশ্চিয়তা একেবারে চলে যাবে আমি তাও বলছি না। একেবার চলে গেলে তো আর সঙ্কট থাকে না। আমি বলতে চাচ্ছি, এই বিষয়গুলোর দ্বন্দ্বকেই আমরা অতি গুরুত্ব দিয়ে বড় করে ফেলছি। এসব দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনা জরুরি। নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার।
সঙ্কট থাকবেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক দল বা নেতাদের আচার-আচরণ কোনোটিকেই আপনি ইতিবাচকভাবে দেখতে পাবেন না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভাষা ব্যবহারের বিষয়টিই লক্ষ্য করুন। এটি তো কোনোভাবেই অন্যদের অনুপ্রাণিত করে না। অনুপ্রাণিত করতে না পারাটাই মূল সমস্যা। সঙ্কট তো থাকবেই। ভারত, চীন, মিয়ানমারে কি সঙ্কট নেই? তারা কিন্তু এগিয়েই যাচ্ছে। অর্থাৎ অনুপ্রাণিত করার জন্য নেতৃত্বের যে গুণ থাকা দরকার তা আমাদের এখানে অনুপস্থিত।
সাপ্তাহিক : রাজনৈতিক নেতারা দায় নিয়ে অনুপ্রাণিত করতে পারছে না বলে উল্লেখ করলেন। সমাজে তো এর বাইরেও ক্ষেত্র থেকে যায়। যেমন, সুশীল সমাজ কী তাদের সঠিক ভূমিকা রাখতে পারছে?
আলী রীয়াজ : সিভিল সোসাইটি বলতে আমরা যা বুঝি সেখানে এক বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সিভিল সোসাইটি রাষ্ট্র এবং রাজনীতির মধ্যে দাঁড়িয়ে সমাজের আকাক্সক্ষাগুলো তুলে ধরবে এবং এখানে তাদের ভূমিকার ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটাবে। তার মধ্যে কোনো বিশেষ দলের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা থাকবে না। কিন্তু আমাদের দেশের সিভিল সোসাইটি স্পষ্টত দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। সিভিল সোসাইটিতে এরকম যখন হচ্ছে তখন কিন্তু আপনি আর সিভিল সোসাইটির সদস্য থাকছেন না। তখন আপনি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত অংশ হয়ে পড়ছেন। এই কারণে তারাও সমাজের মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারছে না। তাদের কাছে তখন আমার ভূমিকায় আমার সমর্থিত রাজনৈতিক দল লাভবান হবে কি হবে না তখন সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
ধরুন, সিভিল সোসাইটির মধ্যে যারা বিএনপিকে সমর্থন করেন তারা কী কখনও বলবেন যে গত চার বছরে দেশে উন্নয়ন হয়েছে? সাধারণভাবেই ধরে নিতে পারি, বলবেন না। কিন্তু কিছু না কিছু তো হয়েছে। একইভাবে সরকার সমর্থিত সিভিল সোসাইটিও সরকারের নেতিবাচক কাজের সমালোচনা করতে নারাজ। তারা কিন্তু বলবেন না যে, সরকারের কাঠামোর মধ্যে জবাবদিহিতার অভাব আছে। গত চার বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে তা কিন্তু স্বীকার করবেন না। এটি স্বীকার করলে আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে বলেই তারা মনে করেন।
এখানেই তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি যেটি তার পেশাদারিত্বের জায়গায় থেকে নিরপেক্ষতার পরিচয় তুলে ধরতে পারে।
সাপ্তাহিক : অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। ষাটের দশকে এই উন্নয়নে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। এখন মধ্যবিত্তের বিপরীতে উচ্চবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের দুটি ধারার বিষয়টিই স্পষ্ট হচ্ছে। নানা রকম সুযোগসুবিধার জন্য মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্তের দিকে ছুটছে। এর কারণে কী কোনো সামাজিক প্রতিরোধের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে?
আলী রীয়াজ : আমি তা মনে করি না। দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন সেনাদের স্বৈরশাসন ছিল। এর মধ্যেও কিন্তু অর্থনৈতিক অর্জন হয়েছে। সেই সময় মধ্যবিত্তরাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে।
সাপ্তাহিক : তাহলে আমাদের এখানে কেন মধ্যবিত্ত সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা রাখতে পারছে না?
আলী রীয়াজ : এর কারণ হচ্ছে অস্থিরতা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। আপনি বাণিজ্য করবেন, কোনো নিশ্চিয়তা নেই। আপনি যদি কোনো পেশার সঙ্গে জড়িত থাকেন তবে সেই পেশাগত উন্নয়নের জন্য তাকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি করতে হবে না তারও নিশ্চয়তা নেই। আপনি প্রশাসনে দেখেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে মনে করে, পূর্বের সরকারের দলীয়করণ মোকাবেলা করতে হলে পুরোপুরি উল্টোভাবে দলীয়করণ করতে হবে। এখন এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি বিএনপির আমলে সুবিধা না পান এবং সে যদি আওয়ামী লীগেরও লেজুড়বৃত্তি করতে না পারেন তাহলে কিন্তু বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। তখন তার মধ্যে অস্থিরতা চলে আসবে। তিনি তখন প্রতিষ্ঠানের চাইতে নিজের দিকে নজর দিতে নানা পথ খুঁজবেন। এই সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতাই দুর্নীতির প্রধান কারণ।
অস্থিরতার আরও প্রভাব দেখতে পাবেন। বাংলাদেশে পিটিয়ে হত্যার প্রবণতা বেড়েছে। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে, মানুষ জানে অন্যায়ের জন্য কাউকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও তার বিচার হবে না। এমনকি পুলিশও জানে যে তার কিছু করার নেই। তার মানে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মানুষ অস্থিরতা প্রকাশ করছে। এই অস্থিরতা থেকেই তৈরি হচ্ছে ভয়ের সংস্কৃতি। আর ভয়ের সংস্কৃতি মানেই সমাজের সবাই শঙ্কিত। মানুষ তার ন্যূনতম মৌলিক অধিকার নিয়েও শঙ্কিত। সমাজে এর নানা প্রতিফলন দেখতে পাবেন। রামুর ঘটনা লক্ষ্য করুন। এই অবস্থা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার সংখ্যালঘুরা একধরনের মানসিক চাপের মধ্যে বাস করছে। তাদেরকে ভয় দেখিয়েই হামলা করা হয়েছে। বিষয়টি এমন যে, আমি যদি মুসলমান হই তাহলে আমার কাছে বৌদ্ধদের মন্দিরে হামলার বিষয়টি বৈধতা পাচ্ছে। আসলে কি তাই? অস্থিরতাই এই বৈধতা দিচ্ছে। প্রশাসনে চাপ দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে সংঘর্ষ, বিশৃঙ্খলা শুধু ভুক্তভোগিরই ক্ষতি করে তা নয়। যখন অসংখ্য ক্যামেরার সামনে বিশ্বজিৎ দাসকে হত্যা করা হচ্ছে তখন কি শুধুই বিশ্বজিৎ মারা যাচ্ছে? এই হত্যার মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষকে বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, তুমি যদি ভিন্ন মত পোষণ কর, তুমি যদি আমার কথা না শোনো তাহলে তোমারও বিশ্বজিৎ-এর মতো পরিণতি হবে। রামুর ঘটনা শুধু কি সংখ্যালঘু মানুষের ওপর হামলা করা? তা নয়। এটি তাদের মধ্যে ভয়ের বার্তা পৌঁছে দেয়া। যেটি ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরাও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করে জানান দিয়েছিলেন। শুধু হিন্দুদের সম্পত্তি লোভের জায়গা থেকেই এই হামলা নয়, তাদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেয়াই ছিল আসল উদ্দেশ্য।
সাপ্তাহিক : এক সময় মনে করা হতো এরকম সঙ্কট উত্তরণে মূলধারার রাজনীতির বাইরে বাম রাজনীতি একটি আশার আলো দেখাতে পারে। এ ব্যাপারে আপনার বিশ্লেষণ কি? বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাম রাজনীতি কি কোনো নতুন অবস্থান দাঁড় করাতে পারবে?
আলী রীয়াজ : বাংলাদেশে প্রচলিত অর্থে বাম রাজনীতির সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। বিশ্বব্যাপী বাম রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এটি সর্বত্রই হয়েছে। ইউরোপে হয়েছে। আপনি যদি লাতিন আমেরিকার দিকে তাকান তাহলে পরিবর্তন দেখতে পাবেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাম রাজনীতিরও ভিন্নতা আসবেই। বাংলাদেশের বামপন্থিরা এই পরিবর্তনের জায়গাটা ধরতে পারেনি। আমাদের অনেক সঙ্কটের কারণই হচ্ছে পরিবর্তনের উপলব্ধির অনুপস্থিতি। আপনি ষাটের দশকের মধ্যবিত্তের ভূমিকার কথা বললেন। তখন অনেক তরুণই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতেন। এখন কিন্তু সেই জায়গাটা নেই। প্রশ্ন হচ্ছে নেই কেন? এর কারণ হচ্ছে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রাজনীতির যে কাঠামো দাঁড় করানো দরকার বাম রাজনীতিবিদরা তা পারেননি।
সাপ্তাহিক : তার মানে পুরো লাতিন আমেরিকায় বামপন্থিদের যে উত্থান, তা কি এক ধরনের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে?
আলী রীয়াজ : অবশ্যই। শুধু বাম রাজনীতিই নয়। আপনি দেখবেন, ইসলামপন্থি রাজনীতিতেও সারা পৃথিবীতে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি নেপালেও বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় বামপন্থি এবং ইসলামপন্থিরা সেই পুরনো ধারাতেই আটকে রয়েছে। মিসরে ব্রাদারহুড তাদের রাজনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। তুরস্কে পরিবর্তন এসেছে। এমন কি সিরিয়া, লিবিয়ার সঙ্কটময় অবস্থার মধ্য দিয়ে যে সব ইসলামপন্থি দল ওঠে আসছে তারাও পরিবর্তিত হয়েই আসছে। যদিও আমি ইসলামপন্থি রাজনীতি সমর্থন করি না। কিন্তু এ নিয়ে গবেষণা করি বলেই তাদের পরিবর্তনটা ধরতে পারছি।
সাপ্তাহিক : পরিবর্তনের বিষয়টি যদি পরিষ্কার করে বলতেন?
আলী রীয়াজ : যেমন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা এ নিয়ে মিসরে এক সময় মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে সংশয় ছিল। কিন্তু এই সংশয় কাটিয়েই কিন্তু তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। দেখুন, লেবাননে ইসলামপন্থি একটি দলের নাম হিজবুল্লাহ। হিজবুল্লাহ শব্দের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর দল। এখন আমি যদি হিজবুল্লাহর বিরোধিতা করি তাহলে কার বিরোধিতা করছি? আল্লাহর বিরোধিতা করছি। তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তো তার থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু হিজবুল্লাহ সে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। হিজবুল্লাহও এখন অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি চায়। এক সময় ইসলামি দলগুলো শরীয়া আইনের বাইরে আর কোনো বিষয়ে গুরুত্ব দিতেন না। এখন কিন্তু তারা পার্লামেন্ট, প্রশাসন, প্রচলিত আদালত গ্রহণ করে নিচ্ছে। এগুলোই পরিবর্তন। মওদুদী, হাসান আল বান্না, সাঈদ কুতুবের মতো ব্যক্তিত্বের ধারণাকে ধারণ করেই কিন্তু ইসলামপন্থিরা পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তন যে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই ঘটছে ব্যাপারটি তা নয়। ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দেশেও কিন্তু ইসলামপন্থিদের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামপন্থিদের মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ভারতে কেবল ইসলামপন্থিদের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তারা সবাই মিলে একটি দল গঠন করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে কোনো পরিবর্তন নেই।
বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মধ্যে যেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি তেমনি বামপন্থিদের মধ্যেও কোনো পরিবর্তন নেই। ইউরোপে দেখেন, বামপন্থিরা সেখানকার বাস্তবতা বা পরিবেশ বুঝেই আন্দোলন করছে। কিন্তু আমাদের এখানকার বামপন্থিরা তা মানতে চান না।
সাপ্তাহিক : সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীও তো তাদের সংবিধানে পরিবর্তন এনেছে। তারাও গণতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বলছে। বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?
আলী রীয়াজ : আপনি জামায়াতে ইসলামের যে উদাহরণ দিলেন সেটা কিন্তু তারা আন্তরিকভাবে করেনি। দলের মধ্যে আলোচনা না করে কাগজে পরিবর্তন এনেছে। চাপের কারণে তারা এটি করছে। মুসলিম ব্রাদারহুড কিন্তু সেভাবে পরিবর্তন আনেনি। ইসলামপন্থি বলি আর বুর্জোয়া দলগুলোর কথাই বলি পরিবর্তন আনতে হলে দলের মধ্যে আলোচনা করতেই হবে।
সাপ্তাহিক : আমরা একটি বিষয় লক্ষ্য করছি, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো মূলধারার দলগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে নতুনদের রিক্রুট হচ্ছে না। বামপন্থিরাও সেই অর্থে জনবল বাড়াতে পারছে না। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। তারা তো কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়। সেই ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ইসলামি রাজনীতির সম্প্রসারণের সম্ভাবনা আছে কীনা?
আলী রীয়াজ : ইসলামপন্থিরা খুব বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দাঁড়াবে আমি তা মনে করি না। এর একাধিক কারণ রয়েছে। এখন তারা যে আদর্শিক অবস্থানে রয়েছে তা খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি গত নির্বাচনের ফলাফল যদি দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন। গত নির্বাচনে বিশাল একটি অংশ নতুন ভোটার ছিল। কিন্তু ইসলামপন্থিরা এই নতুন ভোটারদের টানতে ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে আমি শুধু জামায়াতে ইসলামকেই বোঝাচ্ছি না। একজন তরুণ ভোটারকে যে আদর্শ দিয়ে আকৃষ্ট করতে হয় তা ইসলামি দলগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত। সুতরাং আমি মনে করি না, ভোটের রাজনীতি দিয়ে ইসলামপন্থি দলগুলো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারবে। কিন্তু হুমকি রয়েছে অন্য জায়গায়। হুমকি হচ্ছে, ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি অংশের সঙ্গে টেররিজমের সম্পর্ক। কারণ সন্ত্রাস তৈরি করতে বেশি লোক লাগে না। আরেকটি বিষয়, বাংলাদেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য এবং আমার মতে তা দুর্ভাগ্য আর তা হচ্ছে ইসলামপন্থিরা তাদের সমর্থনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করে। আনুপাতিক হারে যে প্রভাব থাকার কথা ছিল তার চাইতে অনেক বেশি শক্তি তারা দেখিয়ে থাকে। এর কারণ হচ্ছে, প্রধান দুই রাজনৈতিক দল তাদের সুবিধার জন্য এদের সঙ্গে ঐক্য করে। এই ঐক্য করার মধ্যে তাদের বৈধতা দেয়। এখন বিএনপি করছে। এক সময় আওয়ামী লীগ করত বা আগামীতে করতে পারে।
সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। এই বিচারকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামের বর্তমানে যে কার্যক্রম চলছে, এতে আগামী দুই-তিন বছর পর তাদের রাজনীতিতে কী প্রভাব দেখা দিতে পারে?
আলী রীয়াজ : প্রথম কথা হচ্ছে, যুদ্ধপারাধের বিচারকে আমি ইসলামপন্থি রাজনীতির বাইরে রেখে বিবেচনা করি। যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়া খুবই জরুরি। কারণ এটি জাতির দায়। তবে স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্যভাবে হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তি ক্ষতির মধ্য দিয়েই জাতীয় ক্ষতি হয়েছে। এই বিচারের মধ্য দিয়ে সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কিন্তু সংগঠন হিসেবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়নি। যাদের বিচার হচ্ছে তাদের মধ্যে বিএনপিরও লোকজন রয়েছে। যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদেরই কেবল বিচার হচ্ছে। জাতি হিসেবে গর্ব করার জন্যই এই বিচার করা দরকার। এই বিচার অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।
সাপ্তাহিক : এরপরেও বলতে হয়, যুদ্ধাপরাধের প্রসঙ্গ আসলে জামায়াতে ইসলামীর নাম আসে। সুতরাং এই বিচারের মধ্যে ইসলামপন্থি রাজনীতি সমাজ থেকে উঠে যাবে নাকি আরও শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হবে? রাষ্ট্রীয় অনেক চাপের মধ্যেও আমরা মিসরে ব্রাদারহুডের টিকে থাকা এবং উত্থানকে দেখতে পেলাম।
আলী রীয়াজ : বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতি নিঃশেষিত হয়ে যাবে এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা এই বিচারে অভিযুক্ত। এতে তাদের সাংগঠনিক বিপর্যয় আসতেই পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ইসলামপন্থি রাজনীতি একেবারে উঠে যাবে। এটি মনে করা ভুল হবে। আমি চাই বা না চাই ইসলামি রাজনীতি এখানে থাকবে। এই বিচারের মধ্য দিয়ে তাদের নেতৃত্ব সঙ্কট হতে পারে আবার পজিটিভও হতে পারে। পজিটিভ হতে পারে এই কারণে যে, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর যে ভয়াবহ ভুল সিদ্ধান্ত এবং এই সিদ্ধান্তের জন্য যারা দায়ী তারা যদি নেতৃত্বে না থাকেন তাহলে নতুন নেতৃত্ব দলকে সামনে নিয়ে যাওয়ার আরও সুযোগ পাবে। কিন্তু দলকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পরিবর্তন আনতেই হবে। নির্যাতন-জুলুম থাকলেও মিসরে ব্রাদারহুড তাদের দলের মধ্যে পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশে আমি এখন পর্যন্ত এমন কিছু দেখতে পাইনি যে হঠাৎ করে ইসলামি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অবস্থান করবে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু ভারতে তো ধর্মীয় সংগঠন বিজেপি এগিয়েই যাচ্ছে। গুজরাটে বিজেপি নেতা মোদির উপর্যুপরি জয়ী হওয়া তো বিজেপির সাফল্যই প্রমাণ করে।
আলী রীয়াজ : ভারতে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস এবং বিজেপির অবস্থানই শক্তিশালী। মানুষ যখন কংগ্রেস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন তাকে বিজেপির কাছে যেতে হয়। কারণ তার কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। এর মধ্য দিয়ে বিজেপির এক ধরনের স্থায়িত্বও তৈরি করেছে। ভারতের কোনো একটি রাজ্যে যদি বামপন্থি বা অন্য কোনো দল আর একটিু ভালো করত তাহলে কিন্তু বিজেপি এই অবস্থান ধরে রাখতে পারত না। বিজেপিকে মোকাবেলা করতে হলে বর্তমান ক্ষমতাশীল ইউপিএ জোটে পরিবর্তন আনতে হবে।
সাপ্তাহিক : মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরব বসন্তে রাজনীতির পরিবর্তন এলো। সবাই ধারণা করেছিল যে সেখানে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরি হবে। কিন্তু দেখা গেল যে নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলগুলোই ভালো করছে। এটি কেন হলো বা এর গতিপ্রকৃতি কী?
আলী রীয়াজ : আমরা সবাই এখানে পরিবর্তন আশা করেছিলাম। গণমাধ্যম মনে করেছিল, মিসরে হোসনি মোবারকের পতনের পরপরই গণতন্ত্র চলে আসবে। এটা একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে স্বৈরশাসনের ফলে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরেও তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি। পারেনি কারণ হচ্ছে, তারা অনেক দলে বিভক্ত। নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি। কিন্তু ইসলাপন্থিরা এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে। তবে ওইসব দেশে আপাতত ইসলামপন্থিরা ক্ষমতায় এলেও পরিবর্তনও আসবে। মানুষ গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমি মনে করি, সেখানে গণতন্ত্র আসলেও এর কাঠামো পশ্চিমা ধাঁচের থাকবে না। নিজেদের মতো করে এক ধরনের গণতন্ত্র তৈরি করে নেবে। তবে এর জন্য সময় লাগবে।
সাপ্তাহিক : আপনি পরিবর্তনের কথা বললেন। পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই কিন্তু ইরান শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। আবার সিরিয়াও সেখানে শক্ত অবস্থান নিতে যাচ্ছে। আগামীতে এ দুটি রাষ্ট্র কোন অবস্থানে থাকতে পারে?
আলী রীয়াজ : সিরিয়ার লড়াই আসলে ঐ অঞ্চলে তুরস্ক এবং ইরানের প্রভাব বিস্তারের ফল। কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে তুরস্ক চাইছে সেখানে তাদের শক্ত অবস্থান হোক। আবার ইরান চাইছে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এখানে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের বিষয়টিও স্পষ্ট। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকে কিন্তু ইরানের প্রভাব বেড়ে গেছে। সিরিয়াতেও ইরানের প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। ইরান বাশার আল আসাদকে সমর্থন করে আবার হামাসকেও সমর্থন করে। হামাস আসাদের কাছ থেকে সরে গেছে। এ কারণে হামাসের সঙ্গে ইরানের একটি আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এসবের মধ্যে সাধারণ মানুষও যেমন গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে যেতে চাইছে অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাপ্তাহিক : পরস্পরবিরোধী হলেও তুরস্ক এবং ইরান মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বে বিশেষ ধারা তৈরি করেছে। এতে আমাদের জন্য কি কোনো সুযোগ তৈরি হলো নাকি বৈরিতা দেখা দেবে? মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?
আলী রীয়াজ : বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বড় দুর্বলতা হলো একমুখী নীতি। এই সরকার মনে করে যে, কেবল ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করলেই চলবে। আবার বিএনপি মনে করে, পাকিস্তান বা চীনকে গুরুত্ব দিলেই হবে। এ কারণে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
আমি মনে করি, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সেখানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থেই এ গুরুত্ব দেয়া।
শুধু তাই নয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যত বন্ধু রাষ্ট্র বাড়ানো যাবে ততোই মঙ্গল হবে। বন্ধুর সব নীতিই মানতে হবে বিষয়টি তা নয়। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক নানাবিধ পরিবর্তনের কারণে সম্পর্কের কাঠামো কিন্তু আগের মতো নেই। কিছু বিষয় ছাড় দিতে হয় আবার কিছু বিষয় গ্রহণ করতে হয়। শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, আমাদের পূর্বের দিকে তাকাতে হবে। কারণ নানা কারণেই এই অঞ্চল গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্ভাবনা এখন পূর্বে। এ কারণে ভারত মহাসাগরে চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া। এই দেশগুলো নানা কৌশল অবলম্বন করে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র দূর থেকে এসে এখানে আধিপত্য তৈরি করছে। সুতরাং আমাদের দূরে থাকার কোনো সুযোগ নেই। ভিয়েতনামের গত পাঁচ বছরের উন্নয়ন দেখেন। বারাক ওবামা কেন মিয়ানমার, কম্বোডিয়ায় হাজির হচ্ছেন? এটি ভাবতে হবে।
সাপ্তাহিক : আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সেই অর্থে কার্যকর কোনো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারিনি। এর কারণ কি ভারতকে অধিক গুরুত্ব দেয়া নাকি অন্য কোনো সমস্যা?
আলী রীয়াজ : আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারিনি। পররাষ্ট্র নীতিতে কোন বিষয়গুলো নেবো আর কোনগুলো নেবো না আমরা এখনও তা নিশ্চিত করতে পারিনি। এটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যকেও গুরুত্ব দিতে হবে আবার পূর্ব এশিয়াতেও সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। যেমন পাকিস্তান মধ্য এশিয়ার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তান জানে তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেই অর্থনৈতিক অবস্থান দাঁড় করাতে হবে।
আমাদের অবস্থানটা কোথায় সেটা বুঝতে হবে। আমি মনে করি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই আমাদের অধিক নজর দিতে হবে। কারণ এখানেই এখন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ বিপর্যয়ের মধ্যেও টিকে থাকতে পারছে। কিন্তু আমাদের অবস্থা খারাপ হলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? ফলে ঘরে বসে থাকার সময় নেই। কেউ এমনিতে এসে দরজার কড়া নড়াবে না। নিজেদের অবস্থান নিজেদেরই তৈরি করতে হবে।
সাপ্তাহিক : এই সরকার ভারত এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে এক প্রকার টানাপড়েনে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে যেমন বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলন উপলক্ষে কাতারে শ্রমিকদের প্রচুর কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। ভারত, নেপাল সে সুযোগ নিয়েছে। আমরা তা তেমনভাবে কাজে লাগাতে পারিনি।
আলী রীয়াজ : পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ শক্তিশালী কোনো লবি তৈরি করতে পারেনি। কাতারের সঙ্গে আমাদের সকল নীতি এক নাও হতে পারে। কিন্তু সেটা বলতে হবে যে, আমরা তোমাদের এই নীতি মানতে পারছি না এবং এই নীতিগুলো গুরুত্ব দিচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে, রাশিয়াকেও কাছে রাখতে হবে। একেক দেশের সঙ্গে একেক আঙ্গিকে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সবাই এখন এই নীতিতেই চলছে।
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ বা অর্থনীতিতে ভারতের তো শক্তিশালী অবস্থান। তো ভারতকে ম্যানেজ করে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি বা উন্নয়নের সম্ভাবনা কতটুকু?
আলী রীয়াজ : এটি সম্ভব। এতে অন্যরাও বুঝতে পারবে যে, কেবল আমিই তার বন্ধু নই। তার আরও বন্ধু আছে। ভারতের সম্পর্কে অবশ্যই বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু দিল্লি হয়েই আমাকে ওয়াশিংটনে যেতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ভালো। তাই বলে কি আমি দিল্লি দিয়েই নিজেকে চেনাব। আমি নিজেও তো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারি।
সাপ্তাহিক : দিল্লি কী স্বাভাবিকভাবে সেটা মেনে নেবে?
আলী রীয়াজ : না। তারা চাইবে না। দিল্লি চাইবে ঢাকা এক্ষেত্রে তার ওপরে নির্ভর করুক। কিন্তু আপনি যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন তাহলে সে চাইবে যে, তার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ঢাকা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সাপ্তাহিক : এই যে আপনি পররাষ্ট্রনীতির নানা আকাক্সক্ষার কথা বললেন, তাহলে বাস্তব অবস্থানে তো আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।
আলী রীয়াজ : হ্যাঁ। অনেক পিছিয়ে আছি। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, অনেক সম্ভাবনার জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারিনি। অভ্যন্তরীণ নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে আমরা স্পষ্ট কোনো কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। আজ সম্পর্ক হলো। ছয় মাস পর আর কোনো যোগাযোগ নেই। এটি সম্পর্কে কোনো স্থায়িত্ব দেয় না। আপনাকে অনেক ভেবে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনাকে আঞ্চলিক নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে সব নীতিই যে প্রাধান্য পাবে বিষয়টি তা নয়। কিন্তু আলোচনা করতে হবে। বৈশ্বিক ধারণা থেকেই আপনাকে চিন্তা করতে হবে।
সাপ্তাহিক : আবারো একটু অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আসি। স্বাধীনতাযুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই আর নেই। মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম ধীরে ধীরে নেতৃত্বে আসছেন। প্রজন্মগতভাবে নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে কী বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসতে পারে?
আলী রীয়াজ : কেবলমাত্র প্রজন্মগত কারণে নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন না হলে নতুন নেতৃত্ব কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে না। তবে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কারণ নতুন প্রজন্মের কাছে বাস্তবতার ভিন্নতা গুরুত্ব পায়। তবুও কেবল পরিবর্তনের পরিবর্তে সম্ভাবনাই দেখা যায়। কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোই এমন। নেতৃত্বে কে এলো আর কে গেল সেটা বড় কথা নয়। সাধারণ মানুষও একইভাবে দেখে অভ্যস্ত।
সাপ্তাহিক : দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্রগুলোর চিত্রও তো একই?
আলী রীয়াজ : পাকিস্তান বা ভারতে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষে এমন থাকলেও তৃণমূলে কিন্তু পরিবর্তন আছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো সাংসদ মারা গেলে ওই সাংসদের স্ত্রী বা সন্তানরাই নেতৃত্বে আসছে। আপনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখতে পাবেন। নেতৃত্বে যে পরিবার থেকে লোক আসছে সমস্যা সেখানে নয়, সমস্যা হচ্ছে এর প্রক্রিয়ায়। প্রক্রিয়ার কারণে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না। সুতরাং আগামী ২০২০ সাল নাগাদ নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে কিন্তু রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি না। কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে কোনো লাভ নেই।
সাপ্তাহিক : উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নেতৃত্বের কথা বললেন। এই নেতৃত্ব আগামীতে রাজনীতি বা সমাজে কোনো সংঘাতের কারণ হতে পারে কিনা?
আলী রীয়াজ : দশ বছর পর নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে। তখন কিন্তু আবার একই পরিবার থেকে অধিক ব্যক্তি নেতৃত্বে আসতে চাইবে। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিতেই পারে। আবার সমঝোতাও হতে পারে। তারা নিজেরাই ভাগবাটোয়ারা করে নিতে পারে। কেউ হয়ত বলবে, তুমি নেতৃত্বে থাক কিন্তু অর্থনৈতিক সেক্টর আমি নিয়ন্ত্রণ করব। আবার কল্যাণের দিকেও যেতে পারে। ২০২০ সালের পরেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কারণ এর মধ্যেই স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কালীন প্রজন্ম রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সরে যাবেন।
সাপ্তাহিক : সেনাবাহিনী এখানে কেন্দ্রীয় সংগঠন। রাষ্ট্রের নানারকম সঙ্কটে কেন্দ্রীভূত শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে সেনাবাহিনী ভূমিকা রাখে। রাজনীতিতে তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা কেমন হতে পারে?
আলী রীয়াজ : এই বিষয়টি নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। সেনাবাহিনী এখানে একটি সংগঠিত সংস্থা। দেশে যদি কোনো সঙ্কট সৃষ্টি হয় এবং সেই সঙ্কট মোকাবেলা করার জন্য যদি রাজনৈতিক শক্তি ভূমিকা রাখতে না পারে তখন ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ চলে আসে। এটি সমাজের তৈরি করা সঙ্কটের কারণেই হয়।
সাপ্তাহিক : ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা এখন জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে। আপনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে কীভাবে দেখেন?
আলী রীয়াজ : রাজনৈতিক দুর্বল কাঠামোর কারণেই সম্ভাবনার জায়গাটি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা যাচ্ছে না। এ দেশের জনসম্পদ সম্ভাবনার যে ইঙ্গিতগুলো দিচ্ছে তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। ভূ-রাজনৈতিক কারণে আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি সেখানেও অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনা আমরা এখনও কাজে লাগাতে পারিনি। সেবা খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যায়নি। বিনিয়োগ বাড়েনি। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। সম্ভাবনার কথা বললে এগুলো প্রতিটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সম্ভাবনা আছে কিন্তু দরজা এখনও আটকা। এটি খুলে দিতে হবে। না দিলে ভারত, চীন লুফে নেবে। সম্ভাবনা আছে বলেই চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসছে। প্রতিটি চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাপ্তাহিক : এখন যে রাজনৈতিক কাঠামো সেটি নিয়ে আপনার কী আশাবাদ?
আলী রীয়াজ : এখন যে কাঠামো রয়েছে তা দিয়ে সম্ভাবনা এবং অর্জনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা যায় না। কাঠামোর পরিবর্তন করা দরকার। নেতৃত্বের পরিবর্তন করা দরকার। নেতৃত্বের পরিবর্তন বলতে আমি মানসিকতার পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিচ্ছি। বর্তমান নেতৃত্বও যদি এই সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে পারে তাহলে আমার মনে হয় কেউই এ নিয়ে আপত্তি করবে না। কারণ ১৫ কোটি মানুষই কিন্তু ক্ষমতায় যেতে চায় না। তারা অর্জন চায়। আর এটি যেই করবে তাকেই মানুষ স্বাগত জানাবে।
সাপ্তাহিক : কাঠামোগত পরিবর্তন বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
আলী রীয়াজ : আমি কাঠামোগত পরিবর্তন বলতে মানুষের আস্থার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর মানুষের যেন আস্থা ফিরে আসে এর জন্যই কাঠামোগত পরিবর্তন করা দরকার। যেমন, প্রতিবার পিএসসি’র পরীক্ষা এবং নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এখন এই বিতর্ক থামাতে হলে পিএসসি’র কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।
সাপ্তাহিক : কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতেও তো নেতৃত্ব লাগবে?
আলী রীয়াজ : নেতৃত্ব আছে কিন্তু এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করার নেতৃত্ব নেই। সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই শক্তিশালী নেতৃত্ব লাগবে। ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট আদর্শকে ধারণ করে স্বাধীন হয়েছে। এখন কিন্তু তারা আবার মার্কিন নীতিকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছে। এটি কিন্তু একদিনে হয়নি। নেতৃত্বের মানসিকতার পরিবর্তন দিয়েই এটি সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভিয়েতনাম স্বাধীন হয়েছে। এই সত্য বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা উপলব্ধি করাটাও আরেক সত্য।
সাপ্তাহিক : রাজনীতি ভালো না হলে সংগঠন হচ্ছে না। সংগঠন না হলে রাজনীতি হচ্ছে না। এর মধ্যে আমরা কোথায় দাঁড়াচ্ছি?
আলী রীয়াজ : এগুলো পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু কোথাও না কোথাও বৃত্ত (সাইকেল) ভাঙতে হয়। কোথাও না কোথাও দাঁড়াতে হয়। আর এই ভাঙার কাজটি তরুণরাই করবে। এটি তারা বুঝতে পারবে এবং আমার মনে হয়, বুঝতে পারছেও বটে।
নেতারা মনে করেন, ভোটাররা তাদের ভালোবেসে ভোট দিয়েছেন। ভালোবাসা আছে বটে। কিন্তু এর চাইতে বড় সত্য হচ্ছে ভোটাররা তাদের দায়িত্ব দেয়। এই দায়িত্বের বিষয়টি নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন না। এ কারণেই পরিবর্তন আসে না।
ছবি : কাজী তাইফুর
সাক্ষাতকারটি 'সাপ্তাহিক' পত্রিকায় গৃহীত ও প্রকাশিত।