১৬ বছর পর নিউইয়র্ক মাতালো মাইলস
এইদেশ ডেস্ক, সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১২


‘চাঁদ-তাঁরা সূর্য নও তুমি, ধিকি ধিকি আগুন জ্বলে, নিঃস্ব করেছো আমায়, - এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়ে নিউইয়র্কের দর্শক-শ্রোতাদের দারুন মাতালো তারকা ব্যান্ড দল মাইলস। প্রবাসীরা সেই ১৬ বছর আগে নিউইয়র্কে উপভোগ করেছিলেন তাদের কনসার্ট। দীর্ঘদিন পর প্রবাসীদের মাইলসের কনসার্ট উপভোগ করার এবার সুযোগ করে দিল নিউইয়র্কের মাল্টি মিউজিক মিডিয়ার (থ্রি-এম) কর্ণধার এবং প্রবাসের অতি পরিচিত মুখ কণ্ঠশিল্পী তানভীর শাহীন।
রোববার নিউইয়র্ক সিটির ফ্ল্যাশিং-এর এসোসিয়েশন অব হিন্দু টেম্পল কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় মাইলসের কনসার্ট। রাত ৯টায় গানের আসর বসার কথা থাকলেও তা শুরু হয় রাত সাড়ে৯টায়। বিশাল অডিটরিয়ামে পা রাখা মাত্রই দর্শক-শ্রোতারা মুহুর্মূহ করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান মাইলস সদস্যদের। মঞ্চে ওঠামাত্রই মাইলস সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন তানভীর শাহীন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই মাইলস সদস্যরা সুরের ঝংকারে ভাসিয়ে দেন শ্রোতাদের। তাদের জনপ্রিয় গানের তালে তালে দর্শক শ্রোতারা নেচেছেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে বুড়োরা পর্যন্ত সামিল হয়েছিলেন মাইলসের কনসার্ট উপভোগ করতে।
আলোক ঝলমল বিশাল মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন মাইলসের দলনেতা শাফিন আহমেদ ও হামিন আহমেদ। তাদের সঙ্গে ছিলেন মানাম আহমেদ, জুয়েল ও তুর্য্য। গানের ফাকে ফাকে তারা স্বীকৃতি দিলেন নিউইয়র্কের দর্শক-শ্রোতারাই শ্রেষ্ঠ। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কনসার্ট। শেষ দিকে মাইলস সদস্যদের অটোগ্রাফ সম্বলিত দুটি টি-শার্টের নিলাম ওঠে। সর্বোচ্চ দরদাতাদের মাঝে টি-শার্ট দুটি বিতরণ করা হয়। কনসার্টের এমসিএ ছিলেন প্রবাসের পরিচিত মুখ পাপিয়া আশরাফ।
১৬ বছর পর হলেও মাইলসের এবারের কনসার্টটি ব্যতিক্রম। কারণ নিউইয়র্কে কনসার্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যান্ডদলটি তাদের ৩০ বছর পূর্তি পালন করলো।
এর আগে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তানভীর শাহীন মাইলস-এর কনসার্টের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, মাইলসের বয়স ৩০ বছরেরও বেশি। তাদের অ্যালবামের সংখ্যা বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে আটটি। চলতি বছরেই বের হবে জনপ্রিয় এই ব্যান্ডের নবম অ্যালবাম 'প্রতিচ্ছবি'। হামিন ও শাফিন দু'জনই দুই কিংবদন্তির সন্তান। তাদের মা ফিরোজা বেগমের গাওয়া নজরুল সঙ্গীত আজও কানে লেগে আছে সবার। আর বাবা প্রয়াত কমল দাশগুপ্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশিরভাগ গানের সুরকার।
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই মাইলসের অর্থ একই। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ফরিদ রশীদ এ নামটি রেখেছিলেন। ১৯৮২ সালে বাজারে আসে মাইলসের প্রথম অ্যালবাম 'মাইলস'। এর চার বছর পর প্রকাশ হয় 'অ্যা স্টেপ ফারদার' (১৯৮৬)। তবে দুটোতেই ছিল শুধু ইংরেজি গান। এসব ইংরেজি গানের সুবাদে সঙ্গীতাঙ্গনে মাইলসের অন্যরকম চাহিদা তৈরি হয়। যার ফলশ্রুতিতে বের হয় বাংলা গান নিয়ে মাইলসের প্রথম অ্যালবাম 'প্রতিশ্রুতি' (১৯৯১)। ওই অ্যালবামের 'চাঁদ তারা', 'সে কোন দরদিয়া আমার' গানগুলো জনপ্রিয় হওয়ায় এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। তাই পরের অ্যালবামের নাম রাখা হয় 'প্রত্যাশা' (১৯৯৩)। এর 'ধিকি ধিকি', 'নীলা', 'ফিরিয়ে দাও' গানগুলো সাড়া জাগানোর পর সঙ্কল্পবদ্ধ মাইলসের নতুন অ্যালবামের নাম হয় 'প্রত্যয়' (১৯৯৬)। এ অ্যালবামের 'তুমি নাই', 'জ্বালা জ্বালা' গানের জনপ্রিয়তার প্রবাহে বের হয় 'প্রবাহ' (২০০০)। মাঝে বিশ্বসঙ্গীতের সিঙ্গেলস প্রথার ছোঁয়া দিতে দুটি গান নিয়ে তারা বের করেন 'প্রয়াস' (১৯৯৭)। আগের সাতটি অ্যালবামের সাফল্যে গর্বিত মাইলসের অষ্টম অ্যালবাম 'প্রতিধ্বনি' (২০০৬) বের হয় ছয় বছর বিরতি দিয়ে। এবার আগের কাজগুলোর প্রতিফলন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অ্যালবাম 'প্রতিচ্ছবি' (২০১২)। অ্যালবামটি অডিও সিডি আকারে পেতে শ্রোতাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।
মাইলসের পথচলা
গত তিন দশকে মাইলসের প্রাপ্তির খাতায় আছে অনেক মাইলফলক। এর মধ্যে বাংলাদেশের কোনো ব্যান্ড হিসেবে প্রথম বিদেশ সফর [ভারতের ব্যাঙ্গালোর, ১৯৯৪] করেছে মাইলস। ভারত ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শহর, কানাডায় কনসার্ট করেছে মাইলস। পানীয় পণ্য পেপসি ১৯৯৩ সালে পৃষ্ঠপোষকতা করে মাইলসকে [কোনো ব্যান্ডের এমন স্বীকৃতি এর আগে ছিল না]। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডিস্কো রেকর্ডিং থেকে ১৯৯৪ সালে বের হয় মাইলসের জনপ্রিয় গানের সংকলিত অ্যালবাম 'বেস্ট অব মাইলস'। এটাই বিদেশে বাংলাদেশের কোনো ব্যান্ডের প্রথম প্রকাশিত সিডি। ভারত থেকেও সংকলিত দুটি অ্যালবাম [বেস্ট অব মাইলস ভলিউম ওয়ান ও ভলিউম টু] বেরিয়েছে। চ্যানেল ভি, এমটিভিতে তাদের গানের মিউজিক ভিডিও প্রচার হয়েছে। মাইলসের সাক্ষাৎকার দেখিয়েছে সিএনএন, বিবিসি ও আল জাজিরা। ১৯৮৩, ৮৪ ও ৮৫ সালে টানা তিন বছর একটি দৈনিকের পাঠক জরিপে সেরা ব্যান্ডের স্বীকৃতি পেয়েছিল ব্যান্ডটি। অ্যালবামের জন্য ফটোশুট করা, মঞ্চ পরিবেশনায় নতুনত্ব আনা, শব্দ ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার ছোঁয়াথ সবখানেই মাইলস পথপ্রদর্শক। মানবকল্যাণমূলক অনেক কনসার্টেও বাজিয়েছেন তারা। ২০০৩ সালে ভারতের গুজরাটে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে সঙ্গীত পরিবেশন করে ব্যান্ডটি। এছাড়া দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধমূলক কনসার্টে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তাদের।
১৯৭৮ সালের আগস্টে গড়ে ওঠে মাইলস। এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা হলেন হ্যাপি আখন্দ [কণ্ঠ ও কিবোর্ড], ল্যারি বারনাবি [গিটার], ফরিদ রশীদ [কণ্ঠ ও বেজ গিটার], কামাল মাঈনুদ্দিন [ড্রামস], রবিন [কণ্ঠ ও কিবোর্ড], ইশতিয়াক [গিটার] ও মুসা [গিটার ও কণ্ঠ]। তাদের মধ্যে হ্যাপি ও ল্যারি বেঁচে নেই। মাইলসের বর্তমান লাইনআপ শাফিন আহমেদ [কণ্ঠ ও বেজ গিটার], হামিন আহমেদ [কণ্ঠ ও লিড গিটার], মানাম আহমেদ [কণ্ঠ ও কিবোর্ড], সৈয়দ ইকবাল আসিফ জুয়েল [কণ্ঠ ও গিটার] ও সৈয়দ জিয়াউর রহমান তূর্য [ড্রামস ও পারকাশন]। এর মধ্যে হামিন ও শাফিন ৩৩ বছর, মানাম ৩০ বছর, তূর্য ১৬ বছর আর জুয়েল ১৩ বছর ধরে আছেন মাইলসের সঙ্গে। তাদের সবারই ভিন্ন কিছু করার তাগিদ থাকে সবসময়ই।